সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যুদ্ধের ঢালের আড়ালে হত্যা: আইনস্টাইনের শান্তিচেতনা ও মানবতাবাদ

যুদ্ধের ঢালের আড়ালে হত্যা: আইনস্টাইনের শান্তিচেতনা ও মানবতাবাদ

আলবার্ট আইনস্টাইন, যুদ্ধের ঢাল, শান্তির পায়রা ও ঐক্যবদ্ধ মানুষের চিত্রসহ 'যুদ্ধের ঢালের আড়ালে হত্যা: আইনস্টাইনের শান্তিচেতনা ও মানবতাবাদ' বিষয়ক একটি ফিচার ব্যানার। Feature banner illustration featuring Albert Einstein, a dove of peace, a war shield, and united people, titled 'Murder Behind the Shield of War: Einstein's Peace Philosophy and Humanism'.
"যুদ্ধের ঢালের আড়ালে মানুষকে মেরে ফেলা এক ধরণের খুন ছাড়া আর কিছু নয়" — অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।

সূচনা

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। তিনি শুধু পদার্থবিজ্ঞানের একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী তত্ত্ব যা  ‘আপেক্ষিকতাবাদ’ নামে পরিচিত, তার জন্যই স্মরণীয় নন, তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন মানব সভ্যতার ইতিহাসের একজন অন্যতম সোচ্চার যুদ্ধবিরোধী ও মানবতাবাদী কণ্ঠস্বরের মূর্ত প্রতীক হিসেবে। যখন বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণের চেয়ে ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল, তখন আইনস্টাইন তাঁর নৈতিক অবস্থান থেকেই স্পষ্ট ভাষায় যুদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁর মতে, সভ্যতার নামে বা জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে শুরু হওয়া যেকোনো যুদ্ধই আসলে রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা বৈধতা পাওয়া হত্যাযজ্ঞ মাত্র। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন— “আমার বিশ্বাস, যুদ্ধের ঢালের (বা অজুহাতের) আড়ালে মানুষকে মেরে ফেলা, এক ধরণের খুন ছাড়া আর কিছু নয়।”
আমার বিশ্বাস, যুদ্ধের ঢালের (বা অজুহাতের) আড়ালে মানুষকে মেরে ফেলা, এক ধরণের খুন ছাড়া আর কিছু নয়।
— অ্যালবার্ট আইনস্টাইন
আইনস্টাইনের এই বক্তব্যটি কেবল একজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল না; এটি ছিল মানবসভ্যতার এক অতি বিরল বিবেকের অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া ও নৈতিকতার প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া এক অনিবার্য প্রশ্ন চিহ্ন।

উক্তিটির প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক উৎস

উক্তিটির মূল প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে ইউরোপের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। আসুন ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে একবার দেখার চেষ্টা করি, ঠিক কোন্ পরিস্থিতিতে তাঁর এই যুদ্ধ বিরোধী মূল্যবোধের জন্ম।

১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও প্রাথমিক হতাশা: 

১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন ইউরোপের অনেক নামজাদা বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী নিজ নিজ দেশের জাতীয়তাবাদী উম্মাদনায় প্ররোচিত হয়ে যুদ্ধকে গর্ব ভরে সমর্থন করে যাচ্ছেন। একেরপর এক জার্মান বিজ্ঞানী, যেমন রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ হেবার (Fritz Haber, পদার্থবিজ্ঞানের জনক ম্যাক্স প্লাঙ্ক (Max Planck), এক্স-রে আবিষ্কারের জন্য নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ভিলহেল্ম রন্টজেন (Wilhelm Röntgen) রসায়নে নোবেলজয়ী এমিল ফিশার (Emil Fischer), পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ফিলিপ লেনার্ড (Philipp Lenard) ও ইয়োহানেস স্টার্ক (Johannes Stark) সহ মোট ৯৩ জন বিশিষ্ট জার্মান বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী এবং সেই সঙ্গে জার্মানির শীর্ষস্থানীয় একাধিক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন যুদ্ধের সমর্থনে সরব হচ্ছেন এবং যুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ানোর ইশতেহারে (Manifesto of the Ninety-Three) স্বাক্ষর করছেন, তখন জার্মান সাম্রাজ্যের নাগরিকত্ব ছেড়ে সুইজারল্যান্ডের নাগরিকত্ব* নেওয়া একজন তরুণ যুবক, যাকে আমরা আইনস্টাইন নামে চিনি, তিনি প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, এই বছরেই (১৯১৪) তিনি ‘ইউরোপীয়দের প্রতি আবেদন’ (Manifesto to the Europeans) নামে এক যুদ্ধবিরোধী ইশতেহারে স্বাক্ষর করেন।

২. ‘মাই ক্রুসেড অ্যাগেইনস্ট ওয়ার’ এবং উক্তিটির মূল স্থান:

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত উক্তিটি প্রথম লিপিবদ্ধ হয়েছিল ১৯৩১ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘মাই ক্রুসেড অ্যাগেইনস্ট ওয়ার’ (My Crusade Against War) নামক প্রবন্ধ বা সাক্ষাৎকারে, যা পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত সংকলন ‘দ্য ওয়ার্ল্ড এ্যাজ আই সি ইট’ (The World As I See It) গ্রন্থে স্থান পায়।

৩. আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা:

১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকের মধ্যবর্তী সময়ে সমগ্র ইউরোপজুড়ে শুরু হয় ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের মতো এক ভয়ঙ্কর জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা। বিশ্বযুদ্ধের রেশ কাটার আগেই বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয় আরও এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মহড়া। ইউরোপ তথা প্রায় সমগ্র বিশ্ব সামরিকীকরণের উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় নামার মাধ্যমে আবারও এক নতুন যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে ও যুদ্ধবিরোধী পুস্তিকায় তিনি নিয়মিতভাবে যুদ্ধ ও তার ভয়াবহতা সম্পর্কে নিজস্ব মতামত তুলে ধরতে থাকেন।

কেন তিনি এই উক্তিটি করেছিলেন?

মনে রাখতে হবে, আইনস্টাইনের এই কঠোর ও আপসহীন বক্তব্যের পেছনে কাজ করেছিল তাঁর নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞান-ভাবনা এবং এক গভীর নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ।

[১] আবেগহীন বা প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতার প্রতিবাদ:

সমাজে সাধারণ মানুষ যখন অন্য একজনকে হত্যা করে, আইন তাকে ‘খুন’ হিসেবে গণ্য করে এবং শাস্তি দেয়। অথচ যুদ্ধের মাঠে রাষ্ট্র যখন লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করতে পাঠায়, তখন সেই হত্যাকে ‘দেশপ্রেম’, ‘বীরত্ব’ বা ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে ভূষিত করা হয়। আইনস্টাইন এই চরম নৈতিক দ্বিমুখী আচরণকে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন তাঁর বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সামরিক পোশাক পরিয়ে দিলেই কিম্বা রাষ্ট্রের আদেশ পেলেই একটি খুন তার হিংস্রতা হারায় না—তা আদতে খুনই থেকে যায়।

[২] বিজ্ঞানকে ধ্বংসের কাজে ব্যবহারের বিরোধিতা: 

আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে সহজ ও অর্থপূর্ণ করে তোলা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? 

বস্তুত, রাষ্ট্রনেতারা যখন বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন ও ল্যাবরেটরিকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির কারখানায় পরিণত করেন, তখন বিজ্ঞানের মৌলিক উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। ফলে পুঁজির কাছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়। আমরা আমাদের চারপাশ লক্ষ্য করলেই দেখতে পাই, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি কীভাবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকারকে সংকুচিত করে ফেলেছে। অন্যদিকে পুঁজির কারবারিদের দিয়েছে লাগামহীন সুবিধা। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, রাষ্ট্র যখন এই পুঁজিবাদের দোসর হয়ে ওঠে, এবং পৃথিবীর সম্পদকে (প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ) কুক্ষিগত করার নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে, তখন এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিধ্বংসী চেহারা নেয়, যার কুফল ভোগ করে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষ। আইনস্টাইন এর বিরোধী ছিলেন।

আমরা যা নিয়ে ভাবি না :

রাষ্ট্র যখন পুঁজিবাদের দোসর হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদকে (প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ) কুক্ষিগত করার নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে, তখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিধ্বংসী চেহারা নেয়, যার কুফল ভোগ করে শুধুমাত্র সাধারণ ও মধ্যবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই খেটে খাওয়া মানুষদের অধিকাংশই এই সত্য উপলব্ধি করতে পারেন না। তারা ভাবে, এর মূলে কোন মানুষ নয়, দায়ী নিজের কপাল এবং যা স্বয়ং ঈশ্বর দ্বারা পূর্বনির্ধারিত।

সাম্প্রতিক সময়েও একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে ভারতের সাধারণ মানুষ। অভিযোগ সত্য হলে, ভারতে এসআইআর ২০২৬ সংগঠিত হওয়ার সময় প্রযুক্তির কল্যাণে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি নামে অযাচিত এক বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে তারা। যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের অধিকাংশ এই সাধারণ খটে খাওয়া মানুষ। শুধু বিড়ম্বনা বা হয়রানি নয়, বেশ কয়েকজন মানুষ দুশ্চিন্তায় প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের আরও কিছুদিন এ পৃথিবীতে বাঁচার বৈধ অধিকার ছিল।

[৩] বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা: 

তৎকালীন ইউরোপের অনেক দেশে তরুণদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হতো। আইনস্টাইন এই নীতির কঠোর বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, এটি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বিবেকের ওপর চরম আঘাত। 

এই পটভূমিতেই ১৮৯৬ মাত্র ১৬ বছর বয়সে জার্মানির কঠোর সামরিক ব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদান এড়াতে বাবার সম্মতিতে তিনি তাঁর জার্মান (ভুর্টেমবার্গ নাগরিকত্ব) নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। এর ফলে তিনি পরবর্তী কয়েক বছর রাষ্ট্রহীন (stateless) অবস্থায় ছিলেন। জার্মানিতে ফিরে সামরিক বাধ্যবাধকতায় জড়িয়ে পড়ার চেয়ে তিনি রাষ্ট্রহীন থাকাকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। অবশেষে ১৯০১ সালে তিনি পাকাপাকিভাবে সুইস নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।

আইনস্টাইনের অহিংসা ও শান্তিবাদের প্রকৃতি

শান্তি বা অহিংসার প্রতি আইনস্টাইনের এই অবস্থান কোন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ছিল না; তা ছিল তাঁর প্রবৃত্তিগত উপলব্ধি। তিনি স্পষ্টভাবেই একথা স্বীকার করেছেন যে, তাঁর এই মানসিকতা কোনো জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্ব থেকে উঠে আসেনি, বরং নিষ্ঠুরতা ও হিংসার প্রতি তাঁর সহজাত অপছন্দ থেকেই এর জন্ম।

তবে আইনস্টাইনের এই ভাবনাকে অন্ধ শান্তিবাদ বা নিষ্ক্রিয়তা বললে ভুল হবে। কারণ, তিনি অহিংসার সমর্থক হলেও ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনী ও মুসোলিনের ফ্যাসিবাদী বাহিনীর হাত ধরে যখন চরম পাশবিকতার উত্থান ঘটে, তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে, পরম সহিংস ফ্যাসিবাদকে ঠেকানোর জন্য কখনো কখনো সামরিক প্রতিরোধ বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। আর এই প্রেক্ষাপটেই আমরা তাঁর দ্বিতীয় অবস্থান লক্ষ্য করি। এই অবস্থান থেকেই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টকে চিঠি লিখে পারমাণবিক গবেষণার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির আগে আমেরিকা পারমাণবিক শক্তিকে করায়ত্ত করুক এবং পৃথিবীতে একটি শক্তির ভারসাম্য তৈরি হোক, যাতে নাৎসি জার্মানি সবার আগে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে পুরো বিশ্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে না পারে।

কিন্তু পরবর্তীকালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারমাণবিক বোমার বীভৎস প্রয়োগ দেখে আইনস্টাইন গভীরভাবে মর্মাহত ও অনুশোচনাগ্রস্ত হন। এবং সে কারণেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ‘রাসেল-আইনস্টাইন ইশতেহার’-এর মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র বর্জন ও বিশ্ব শান্তির জন্য লড়াই করে গিয়েছিলেন।

উক্তিটির গভীর তাৎপর্য : 

আইনস্টাইনের এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে কতগুলো মৌলিক দর্শনে:
১. নৈতিকতার সার্বজনীনতা: আইনস্টাইন বুঝিয়েছিলেন, নৈতিকতা কোনো নির্দিষ্ট সীমান্ত বা জাতীয়তাবাদের ওপর নির্ভর করে না। সাধারণ মানুষের জীবনের নৈতিকতার নিয়ম যুদ্ধের ময়দানে এসে হঠাৎ করে বদলে যেতেও পারে না। এর জন্য রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে পুঁজির দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা কাজ করে।
২. রাষ্ট্রের ছদ্মবেশ উন্মোচন: রাষ্ট্রব্যবস্থা কীভাবে মানুষের মধ্যে অন্ধ জাতীয়তাবাদ ঢুকিয়ে দিয়ে সাধারণ নাগরিকদের একে অপরের হত্যাকারীতে পরিণত করে—আইনস্টাইন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সেই মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন।
৩. ব্যক্তিগত দায়িত্ব: যুদ্ধ রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও যুদ্ধের মাঠে ট্রিগার চাপে একজন সাধারণ নাগরিক। সুতরাং ‘রাষ্ট্রের আদেশ পালন করছি’—এই অজুহাতে কোনো হত্যাকে সমর্থন করা যায় না। কারণ, মানুষের নিজস্ব বিবেক রাষ্ট্রীয় আদেশের চেয়েও বড়। একথা সাধারণ মানুষকেই আগে বোঝা দরকার।

বর্তমান বিশ্বে উক্তিটির প্রাসঙ্গিকতা

আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আইনস্টাইনের এই উক্তিটি স্রেফ ইতিহাস নয়, বরং প্রাত্যহিক বাস্তবতার এক জ্বলন্ত দলিল। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উক্তির প্রাসঙ্গিকতা তুলনাহীন:

আধুনিক যুদ্ধ ও প্রক্সি ওয়ার (Proxy War): 

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে যে যুদ্ধগুলো চলছে—তা সে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত হোক, অথবা মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ইসরাইল ও আমেরিকার সাম্প্রতিক নৃশংস সংঘাত হোক কিংবা আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ যুদ্ধগুলো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, ভূখণ্ড বা প্রতিরক্ষা বিঘ্ন হবার অজুহাতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ কাড়ছে। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ মতো সুদৃশ্য ছদ্মবেশে বা অজুহাতে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী ও শিশু প্রাণ হারাচ্ছে, যা আইনস্টাইনের ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক খুন ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রযুক্তিনির্ভর ও দূরত্ব-ভিত্তিক হত্যা: 

বর্তমান যুগে যুদ্ধের রূপ বদলে গেছে। ড্রোন হামলা, স্বয়ংক্রিয় মিসাইল এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নিয়ন্ত্রিত অস্ত্রের যুগে একজন সৈনিক হাজার মাইল দূরে বসে একটি স্ক্রিনে বোতাম টিপেই আস্ত একটা জনপদ ধ্বংস করে দিতে পারে। এই স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধের যুগে হত্যার মানবিক অনুভূতিটুকুও আজ লোপ পেতে বসেছে। আইনস্টাইন যে প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, প্রযুক্তি তাকে আজ আরও বেশি শীতল ও হৃদয়হীন করে তুলেছে। স্টিফেন হকিং এ কারণেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন — “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি হবে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সাফল্য। হয়তো শেষ সাফল্যও, যদি না ঝুঁকি এড়ানো যায়।”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি হবে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সাফল্য। হয়তো শেষ সাফল্যও, যদি না ঝুঁকি এড়ানো যায়।
—স্টিফেন হকিং।

অস্ত্র বাণিজ্য ও কর্পোরেট স্বার্থ: 

তাই আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ আর শুধু কোন রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি এক বিশাল অর্থনৈতিক শোষণ এবং পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সম্পদের উপর কিছু পুঁজিপতি গোষ্ঠীর অধিকার কায়েম করার অনৈতিক আস্ফালনও বটে। শুধু তাই নয়, এই সম্পদের উপর আধিপত্য কায়েম করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি এই আস্ফালনকে সামনে রেখে অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধের আগুন জিইয়ে রাখার মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করার অনৈতিক তাগিদও অন্যতম প্রধান অনুঘটক হয়ে উঠেছে। জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে আসলে একটি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা হচ্ছে, আর তার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

পারমাণবিক ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি: 

বিশ্বের মহাশক্তিধর দেশগুলোর হাতে থাকা পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডার আজ পুরো মানবজাতির অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বা অহংকারের জেরে শুরু হওয়া যুদ্ধ মুহূর্তের মধ্যে মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

উপসংহার

অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের এই ঐতিহাসিক উক্তিটি কেবল যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী শব্দমালা নয়, এটি মানবতার প্রতি এক চরম সতর্কবার্তা। রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সামরিক শক্তি যখন জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে কোনো হত্যাকে 'জরুরি' বা 'প্রয়োজনীয়' বলে ব্যাখ্যা করতে চায়, আইনস্টাইন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, যে ছদ্মবেশেই আসুক না কেন—রক্তপাত মূলত রক্তপাতই, আর হত্যা শেষ পর্যন্ত হত্যাই।

আজকের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিশ্বে যদি সভ্যতাকে টিকে থাকতে হয়, তবে ক্ষমতার অন্ধ অহংকার বা জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা ছেড়ে আইনস্টাইনের এই মানবতাবাদী উপলব্ধিকে গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। যুদ্ধের সকল অজুহাত ও রাজনৈতিক ছদ্মবেশ সরিয়ে রেখে বিশ্বনেতাদের অনুধাবন করতে হবে যে—সহিংসতা কখনোই শান্তির পথ হতে পারে না, আর কোনো আদর্শের জন্যই নিরীহ মানুষের প্রাণ নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
----------xx-----------

* ১৮৯৬ মাত্র ১৬ বছর বয়সে জার্মানির কঠোর সামরিক ব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদান এড়াতে বাবার সম্মতিতে তিনি তাঁর জার্মান (ভুর্টেমবার্গ নাগরিকত্ব) নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। এর ফলে তিনি পরবর্তী কয়েক বছর রাষ্ট্রহীন (stateless) অবস্থায় ছিলেন। জার্মানিতে ফিরে সামরিক বাধ্যবাধকতায় জড়িয়ে পড়ার চেয়ে তিনি রাষ্ট্রহীন থাকাকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। এরপর তিনি ১৯০১ সালে সুইস নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।

মন্তব্যসমূহ

📂 আলী হোসেনের জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলি

হিন্দু কারা? তারা কীভাবে হিন্দু হল?

হিন্দু কারা? কীভাবে তারা হিন্দু হল? যদি কেউ প্রশ্ন করেন, অমিত শাহ হিন্দু হলেন কবে থেকে? অবাক হবেন তাই তো? কিন্তু আমি হবো না। কারণ, তাঁর পদবী বলে দিচ্ছে উনি এদেশীয়ই নন, ইরানি বংশোদ্ভুত। কারণ, ইতিহাস বলছে পারস্যের রাজারা ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এবং ‘শাহ’ শব্দটি পার্শি বা ফার্সি। লালকৃষ্ণ আদবানির নামও শুনেছেন আপনি। মজার কথা হল আদবানি শব্দটিও এদেশীয় নয়। আরবি শব্দ ‘আদবান’ থেকে উদ্ভূত। সুতরাং তাঁর পদবীও বলছে, তিনিও এদেশীয় নন। ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চবর্ণের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মানুষদের, উৎসভূমি হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। তারও আগে ছিল ইউরোপের ককেশাস অঞ্চলে। আসলে এরা (উচ্চবর্ণের মানুষ) কেউই এদেশীয় নয়। তারা নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয়ে তারা গর্ববোধ করতেন। সিন্ধু সভ্যতা পরবর্তীকালে তারা পারস্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ ধরে এদেশে অভিবাসিত হয়েছেন। আর মধ্যযুগে এসে এদেরই উত্তরসূরী ইরানিরা (অমিত শাহের পূর্বপুরুষ) অর্থাৎ পারস্যের কিছু পর্যটক-ঐতিহাসিক, এদেশের আদিম অধিবাসীদের ’হিন্দু’ বলে অভিহিত করেছেন তাদের বিভিন্ন ভ্রমণ বৃত্তান্তে। ...

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন আলী হোসেন  যদি প্রশ্ন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী? মনে হয় অনেকেই ঘাবড়ে যাবেন। কেউ বলবেন, তাঁর বাবা যখন ব্রাহ্ম ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্ম হবেন। যারা লেখাপড়া জানেন না, তারা বলবেন, কেন! উনি তো হিন্দু ছিলেন। আবার কেউ কেউ তথ্য সহযোগে এও বলার চেষ্টা করবেন যে, উনি নাস্তিক ছিলেন। না হলে কেউ বলতে পারেন, ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো?¹ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ভাবনার বিবর্তন  তাহলে সঠিক উত্তরটা কী? আসলে এর কোনোটাই সঠিক উত্তর নয়। চিন্তাশীল মানুষ-মাত্রই সারা জীবন ধরে ভাবতে থাকেন। ভাবতে ভাবতে তাঁর উপলব্ধি এগোতে থাকে ক্রমশঃ প্রগতির পথে। এই সময়কালে জগৎ ও জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একে একে গড়ে তোলেন জীবনদর্শনের নিত্যনতুন পর্ব। তাই এ ধরনের চিন্তাশীল মানুষ আজীবন এক এবং অখণ্ড জীবনদর্শনের বার্তা বহন করেন না। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় তাঁর পথচলার গতিমুখ, গড়ে ওঠে উন্নততর জীবন দর্শন। মানুষ রবীন্দ্রনাথও তাই পাল্টে ফেলেছেন তাঁর জীবন ও ধর্মদর্শন; সময়ের এগিয়ে যাওয়াকে অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথ ও  হিন্দু জাতীয়তাবাদ ১৮৬১ সালের ৭ই মে সোমবার রাত্রি ২টা ৩৮ ...

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি - লিখছেন আলী হোসেন  কপালের লেখন খণ্ডায় কার সাধ্য? জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কিংবা লেখাপড়া জানা-নাজানা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কথাটা মেনে নেয়। জীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাসে কপালের লেখনকে জায়গা করে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং বলা ভালো এব্যাপারে তারা অতিমাত্রায় উদার। মানুষের মনস্তত্বের এ-এক জটিল স্তর বিন্যাস। একই মানুষ বিভিন্ন সময়ে একই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণে ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে। এ রকমই একটি দৃষ্টিকোণ হলো কপাল বা ভাগ্যের ভূমিকাকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে ভাবা। কখনও সে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, আবার কখনও নিজেই ভাগ্যের কাছে নির্দিধায় আত্ম সমর্পন করে। নিজের ব্যার্থতার পিছনে ভাগ্যের অদৃশ্য হাতের কারসাজির কল্পনা করে নিজের ব্যার্থতাকে ঢাকা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। মজার কথা, এক্ষেত্রে মুসলিম মানসের মনস্তত্ত্ব কখনও চেতনমনে আবার কখনও অবচেতন মনে উপরওয়ালাকে (আল্লাহকে) কাঠ গড়ায় তোলে বিনা দ্বিধায়। নির্দিধায় বলে দেয়, উপরওয়ালা রাজি না থাকলে কিছুই করার থাকেনা। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সবই তাঁর (আল...

সীমান্ত আখ্যান, বাঙালির আত্মানুসন্ধানের ডিজিটাল আখ্যান

সময়ের সঙ্গে সমস্যার চরিত্র বদলায়। কিন্তু মুলটা বদলায় না। যদি সে সমস্যা ইচ্ছা করে তৈরি হয়ে থাকে বিশেষ সুবিধা ভোগেই লোভে, তবে তো অন্য কথা চলেই না। স্বনামধন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারের ডকুমেন্টারি ফিল্প 'সীমান্ত আখ্যান' দেখার পর এই উপলব্ধি মাথা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখলাম, দেশ ভাগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যার অবসান হয়নি। শুধু সমস্যার চরিত্রটা পাল্টেছে। এই যে সমস্যা রয়ে গেল, কোন গেল? তার উত্তর ও পাওয়া গেল 'সীমান্ত আখ্যান' এ। আসলে দেশ ভাগ তো দেশের জনগণ চাননি, চেয়েছেন দেশের নেতারা। চেয়েছেন তাঁদের ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত সুবিধাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার নেশায়। আর এই নেশার রসদ যোগান দিতে পারার নিশ্চয়তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে থাকার ওপর। তাই রাজনীতিকরা এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য জনগণকে 'ডিভাইড এন্ড রুল' পলিছি দ্বারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন। এ সমস্যা নতুন না, ব্রিটিশ সরকার এর বীজ রোপণ করে গেছেন, এখন কেউ তার সুফল ভোগ করছে (রাজনীতিকরা) আর কেউ কুফল (জনগন)। 'সীমান্ত আখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দে...

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের ভাগ্যলিপিতে লেখা হয়ে গেছে এই বিখ্যাত প্রবাদটির বিস্তারিত সারাৎসার। একদিকে পাকিস্তান আর অন্যদিকে ভারত – এই দুই প্রতিবেশি দেশের ভুরাজনৈতিক স্বার্থের যাঁতাকলে পড়ে তাদের এই হাল। কিন্তু কেন এমন হল? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না এমন মানুষ ভুভারতে হয়তো বা নেই। কিন্তু সেই জানার মধ্যে রয়েছে বিরাট ধরণের ফাঁক। সেই ফাঁক গলেই ঢুকেছে কাশ্মির ফাইলসের মত বিজেপির রাজনৈতিক ন্যারেটিভ যা তারা বহুকাল ধরে করে চলেছে অন্য আঙ্গিকে। এবার নতুন মাধ্যমে এবং নবরূপে তার আগমন ঘটেছে, যায় নাম সিনেমা বা সেলুলয়েড প্রদর্শনী। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সৌজন্যে অনেক আগেই সফলভাবে তারা এই ন্যারেটিভ দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করে চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। টেলিভিশন সম্প্রচারে কর্পোরেট পুজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যার সূচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রশক্তিকে কুক্ষিগত করতে না পারলে দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব নয়, একথা সাধারণ নিরক্ষর নাগরিক এবং ত...

মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস কী শুধুই ধর্মীয় সংঘাতের ইতিহাস? জেমিনাই এআই-এর সাথে একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক বিতর্ক

মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস কী শুধুই ধর্মীয় সংঘাতের ইতিহাস? জেমিনাই এআই-এর সাথে একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক বিতর্ক ও প্রকৃত সত্যের অনুসন্ধান ভূমিকা : সম্প্রতি আমি ( আলী হোসেন ) গুগলের জেমিনাই এআই (Gemini AI)-এর সাথে ইতিহাস রচনার আধুনিক পদ্ধতি এবং মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মূল্যায়ন নিয়ে একটি দীর্ঘ ও বিতর্কিত আলোচনায় অংশ  নিয়েছিলাম। আলোচনার এক পর্যায়ে এআই-এর প্রথমদিকের কিছু প্রচলিত ও অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যাকে যখন যুক্তি এবং আধুনিক ও সুসংবদ্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি কাঠামোর সামনে দাঁড় করালাম , তখন কীভাবে একটি বড় ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা অন্ধবিন্দু পেরিয়ে আসল সত্যটি বেরিয়ে এলো —তার পুরো বিবরণ পাঠকদের জন্য নিচে হুবহু (সংলাপ আকারে) তুলে ধরা হলো। ইতিহাসকে চেনার জন্য এই আলোচনাটি প্রতিটি ইতিহাসপ্রেমীর মনে নতুন খোরাক জোগাবে। মূল সংলাপ: পাঠক (আলী হোসেন) বনাম জেমিনাই এআই Medieval Indian History - Complete 14 Slides Beyond Religious Conflict ...

শিক্ষা কী, কেন প্রয়োজন এবং কীভাবে অর্জন করা যায়?

শিক্ষা কী, কেন এবং কীভাবে অর্জন করতে হয়? সূচিপত্র : What is education, why it is needed and how to achieve it শিক্ষা কী শিক্ষা হল এক ধরনের অর্জন, যা নিজের ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে নিজে নিজেই নিজের মধ্যে জমা করতে হয়। প্রকৃতি থেকেই সেই অর্জন আমাদের চেতনায় আসে। সেই চেতনাই আমাদের জানিয়ে দেয়, জগৎ ও জীবন পরিচালিত হচ্ছে প্রকৃতির কিছু অলংঘনীয় নিয়ম-নীতি দ্বারা। গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ শক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজে লাগালেই এই নিয়মনীতিগুলো আমাদের আয়ত্বে আসে। এই নিয়ম-নীতিগুলো জানা, বোঝা এবং সেই জানা-বোঝার ওপর ভিত্তি করেই জগৎ ও জীবনকে সর্বোত্তম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার পথ খুঁজে বের করার শক্তি অর্জন করা যায়। এই শক্তিই হল শিক্ষা। এক কথায় : শিক্ষা হল একধরনের সামর্থ বা শক্তি, যা জগত, জীবন ও রাষ্ট্র-পরিচালনার অলঙ্ঘনীয় নিয়মগুলো জানতে, বুঝতে এবং তাকে সফলভাবে প্রয়োগ করতে শেখায়, এবং মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সফল করে তোলে। মনে রাখতে হবে, এই শিক্ষা কখনও কারও মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন হল, শিক্ষা অর্জনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিটা আসলে কী। সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে জানতে হবে, এ...

জল, না পানি : জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয়

জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয় আলী হোসেন  সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে চিত্র শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য পানি শব্দকে বাংলা নয় বলে দাবি করেছেন। বলেছেন, "আমরা কোনোদিন কখনও বাংলা ভাষায় পানি (শব্দটা) ব্যবহার করি না"। শুধু তা-ই নয়, পানি শব্দের ব্যবহারের মধ্যে তিনি 'সাম্প্রদায়িকতার ছাপ'ও দেখতে পেয়েছেন। প্রশ্ন হল - এক, এই ভাবনা কতটা বাংলা ভাষার পক্ষে স্বাস্থ্যকর এবং কতটা 'বাংলা ভাষার ইতিহাস' সম্মত? দুই, জল বা পানি নিয়ে যারা জলঘোলা করছেন তারা কি বাংলাকে ভালোবেসে করছেন? মনে হয় না। কারণ, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা কেউ নিজের সন্তানকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াননি বা পড়ান না। ব্যবহারিক জীবনেও তারা বাংলার ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে বা গান শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, বলা ভালো গর্ববোধ করেন। প্রসংগত মনে রাখা দরকার, বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যারা ভর্তি হয়, তারা অধিকাংশই গরীব ঘরের সন্তান। বলা ভালো, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তারাই বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ, সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর পাশাপাশি, বা...

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন আলী হোসেন বিচার একটি যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। বিচারক কখনই সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না, যদি না এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা ও তার কর্মকর্তারা উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং বিচারককে তা সরবরাহ করতে পারেন। আর বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি শক্তির আধার; তা যার হাতে থাকে, তিনিই বিচারক। এই শক্তি ন্যায়বিচার তখনই দিতে পারে, যখন বিচারক নিরপেক্ষ থাকার সৎ সাহস দেখান এবং সাংবিধানিক আইন এবং তার প্রয়োগ বিষয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তবে তাঁর সফলতা নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনজীবীরা কতটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই তথ্য বিচারকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তার উপর। তাই একজন বিচারক বা বিচার ব্যবস্থা যা বিধান দেয়, তা সব সময় একশ শতাংশ সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হবে - এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো একটি পক্ষ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে ন্যায় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, ...

নিম্নবর্গের মানুষ মার খাচ্ছে কেন

নিম্নবর্গের মানুষ কীভাবে পিছিয়ে পড়েছেন? সমাধান কীভাবে? এদেশের নিম্নবর্গের মানুষ নিজেদের বাঁচাতে যুগ যুগ ধরে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। কখনও বৌদ্ধ (প্রাচীন যুগ), কখনও মুসলমান (মধুযুগ), কিম্বা কখনো খ্রিস্টান (আধুনিক যুগ) হয়েছে। কিন্তু কখনই নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে পাল্টানোর কথা ভাবেনি। পরিবর্তন হচ্ছে অলংঘনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম। যারা এই নিয়ম মেনে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, তারাই লাভবান হয়, টিকে থাকে। “পাল্টে গেলেই জীবন বাড়ে না পাল্টালে নয়, জীবন মানেই এগিয়ে যাওয়া নইলে মৃত্যু হয়” জীবনের এই চরম সত্য তারা অধিকাংশই উপলব্ধি করতে পারেনি। পৃথিবীর যেকোন উন্নত জাতির দিকে তাকান, তারা দ্রুততার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে মেনে নিজেদেরকে পুনর্গঠন করে নিয়েছে। যারা পারেনি বা নেয়নি তারাই মার খাচ্ছে, অতীতেও খেয়েছে। বুদ্ধিমান জাতি নিজের দুর্বলতাকে মেনে নেয় এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময়ের সঙ্গে তাল রেখে নিজেদের চিন্তা এবং চেতনায় পরিবর্তন আনে। খ্রিষ্টান, ইহুদি-সহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জাতি - যারাই এই পরিবর্তন মেনে নিয়েছে তারাই আরও উন্নত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মহানবীর (সঃ) গৌরবময় উত্থান (যা এক ধরণ...