চিনের “গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন”-এর পরবর্তী পরিকল্পনা
![]() |
| চিনের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি পরিবর্তনের নতুন ব্লু-প্রিন্ট: একটি বিশ্লেষণ |
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সামগ্রিক গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং কৃষি ও গ্রামীণ আধুনিকায়নকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া।
১. খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা (Strengthening Food Security) :
এই পর্বে চিন খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। কারণ, চিনের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদী চাপের মধ্যে রয়েছে বলে এই দলিলে (‘১ নং কেন্দ্রীয় দলিল’) উল্লেখ করা হয়েছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাপমুক্ত রাখার জন্য প্রধানত তিনটি পরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা হয়েছে।[I] উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা:
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চিন সরকার ৫০ বিলিয়ন মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে । শস্য উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন (প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন জিন) স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।[II] প্রযুক্তির ব্যবহার:
কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চফলনশীল বীজ ও উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই উপলক্ষে ‘কৃষিতে নতুন মানসম্পন্ন উৎপাদন শক্তি’ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং কৃষি রোবটের ব্যবহার।[III] জমি সুরক্ষা:
শুধু তাই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য মোট আবাদি জমির ‘লাল রেখা’ বজায় রাখা এবং উর্বর কালো মাটি রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে ।২. দারিদ্র্য প্রত্যাবর্তন রোধে নিয়মিত ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা (Regular and Targeted Assistance) :
গত পাঁচ বছরের ক্রান্তিকাল শেষে, দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম এখন একটি নতুন, আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই ধাপে প্রবেশ করছে। কীভাবে এই কাজ করা হচ্ছে?[ক] গতিশীল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা:
একটি আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে যা দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা সমগ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে। এক্ষেত্রে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে এবং একবার ঝুঁকি কেটে গেলে তাদেরকে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত না রেখে কর্মসূচি থেকে গতিশীলভাবে তাদের বের করে আনা হবে।[খ] উন্নয়নমূলক সহায়তা:
অন্যদিকে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দরিদ্রমুক্ত জনগোষ্ঠীকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে ।[গ] অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য সহায়তা:
জাতীয় গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনের জন্য নির্বাচিত ১৬০টি কাউন্টি-সহ অনুন্নত অঞ্চলগুলো অর্থ, জমি, জনবল ও জনসেবায় বিশেষ সহায়তা পাবে ।৩. কৃষকের আয় স্থিতিশীল ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করা (Promoting Steady Income Growth for Farmers) :
কৃষকদের আয় বৃদ্ধিকে গ্রামীণ কাজের সাফল্যের কেন্দ্রীয় মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে। বর্তমানে কৃষিপণ্যের দাম কম এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর চাপ রয়েছে।· পরিচালন আয় (Operating Income):
শস্য উৎপাদনকারীদের জন্য ন্যূনতম মূল্য, ভর্তুকি ও বীমা নীতি জোরদার করা হবে ।· মজুরি আয় (Wage Income):
কাউন্টি-স্তরের শিল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের মজুরি আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে ।· সম্পত্তি আয় (Property Income):
অলস পড়ে থাকা গ্রামীণ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এবং কৃষকদের সম্পত্তির অধিকার শক্তিশালী করে তাদের আয়ের নতুন উৎস তৈরি করা হবে ।· শিল্পায়ন:
কাউন্টি-স্তরের শিল্পগুলোর বিকাশ ঘটানো হবে, যা স্থানীয় সম্পদের ভিত্তিতে অনন্য পণ্য তৈরি করবে। কৃষি ও গ্রামীণ সংস্কৃতি, পর্যটন এবং ই-কমার্সের সমন্বয় ঘটানো হবে । উদাহরণস্বরূপ, আনহুই প্রদেশের ডাবি পর্বতে উচ্চমূল্যের ঔষধি গাছের চাষ এবং গুয়াংশিতে চা বাগানের সম্প্রসারণ এর অংশ ।৪. বসবাসযোগ্য ও কর্মবান্ধব গ্রামীণ পরিবেশ গড়ে তোলা (Building a Beautiful and Harmonious Countryside) :
স্থানীয় অবস্থার ভিত্তিতে একটি সুন্দর ও সুরেলা গ্রাম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে । এদিকে লক্ষ্য রেখে যে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো হল—[1] অবকাঠামো ও পরিষেবা উন্নয়ন:
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টয়লেট আপগ্রেডেশন-সহ গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিবেশ উন্নত করা এবং মৌলিক পরিষেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।[2] পরিকল্পিত উন্নয়ন:
গ্রামীণ স্থানীয় কাঠামোর সমন্বয় ও উন্নত করার মাধ্যমে নগর ও গ্রামীণ এলাকার সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে ।পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ :
মূল খাত |মূল লক্ষ্য | ও কার্যক্রমখাদ্য নিরাপত্তা |উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মিলিয়ন টন বাড়ানো; শস্য উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন টন স্থিতিশীল রাখা।
দারিদ্র্য প্রতিরোধ|সমগ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ; ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে গতিশীলভাবে সহায়তা।
কৃষকের আয় | মূল্য ভর্তুকি, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করে আয়ের তিনটি উৎস সুরক্ষিত করা।
গ্রামীণ পরিবেশ | নগর-গ্রাম সমন্বিত উন্নয়ন; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতিকরণ।
💡 উপসংহার
এভাবে চিনের ‘গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন’-এর পরবর্তী পরিকল্পনা শুধু দারিদ্র্য বিমোচনের অর্জনকে ধরে রাখার জন্য নয়, বরং একটি টেকসই ও আধুনিক কৃষি কাঠামো গড়ে তোলার জন্য একটি সুচিন্তিত পথপরিক্রমা শুরু করা হয়েছে। এটি প্রযুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগগুলো চিনের সামগ্রিক আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।----------xx----------

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন