সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চিনের “গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন” পরিকল্পনা ও ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী মাস্টারপ্ল্যান

চিনের “গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন”-এর পরবর্তী পরিকল্পনা

আধুনিক চিনা গ্রামীণ দৃশ্য—স্মার্ট ট্র্যাক্টর, ড্রোন, দ্রুতগতির ট্রেন এবং ট্যাবলেট হাতে কৃষকেরা। Modern Chinese rural landscape with smart tractors, drones, high-speed train, and farmers with tablets.
চিনের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি পরিবর্তনের নতুন ব্লু-প্রিন্ট: একটি বিশ্লেষণ
চিনের ‘গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন’-এর পরবর্তী পরিকল্পনা অত্যন্ত সুসংহত এবং দূরদর্শী। ২০২৬ সালটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সালটি চিনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০২৬-৩০) প্রথম বর্ষ এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি ‘পরিবর্তনকাল’ শেষ হওয়ার পর প্রথম বছর । এই সময়ে গৃহীত মূল পরিকল্পনাগুলো ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘১ নং কেন্দ্রীয় দলিল’ এবং সরকারি কাজের প্রতিবেদনের খসড়ায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষ্য পূরণের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সামগ্রিক গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং কৃষি ও গ্রামীণ আধুনিকায়নকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া।

১. খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা (Strengthening Food Security) :

এই পর্বে চিন খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। কারণ, চিনের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদী চাপের মধ্যে রয়েছে বলে এই দলিলে (‘১ নং কেন্দ্রীয় দলিল’) উল্লেখ করা হয়েছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাপমুক্ত রাখার জন্য প্রধানত তিনটি পরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা হয়েছে।

[I] উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা:

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চিন সরকার ৫০ বিলিয়ন মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে । শস্য উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন (প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন জিন) স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।

[II] প্রযুক্তির ব্যবহার:

কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী বৈজ্ঞানিকপ্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চফলনশীল বীজ ও উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই উপলক্ষে ‘কৃষিতে নতুন মানসম্পন্ন উৎপাদন শক্তি’ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং কৃষি রোবটের ব্যবহার

[III] জমি সুরক্ষা:

শুধু তাই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য মোট আবাদি জমিরলাল রেখা’ বজায় রাখা এবং উর্বর কালো মাটি রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে ।

২. দারিদ্র্য প্রত্যাবর্তন রোধে নিয়মিত ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা (Regular and Targeted Assistance) :

গত পাঁচ বছরের ক্রান্তিকাল শেষে, দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম এখন একটি নতুন, আরও প্রাতিষ্ঠানিকটেকসই ধাপে প্রবেশ করছে। কীভাবে এই কাজ করা হচ্ছে?

[ক] গতিশীল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা:

একটি আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে যা দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা সমগ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে। এক্ষেত্রে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে এবং একবার ঝুঁকি কেটে গেলে তাদেরকে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত না রেখে কর্মসূচি থেকে গতিশীলভাবে তাদের বের করে আনা হবে।

[খ] উন্নয়নমূলক সহায়তা:

অন্যদিকে শিল্পায়নকর্মসংস্থানের মাধ্যমে দরিদ্রমুক্ত জনগোষ্ঠীকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে ।

[গ] অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য সহায়তা:

জাতীয় গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনের জন্য নির্বাচিত ১৬০টি কাউন্টি-সহ অনুন্নত অঞ্চলগুলো অর্থ, জমি, জনবলজনসেবায় বিশেষ সহায়তা পাবে ।

৩. কৃষকের আয় স্থিতিশীল ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করা (Promoting Steady Income Growth for Farmers) :

কৃষকদের আয় বৃদ্ধিকে গ্রামীণ কাজের সাফল্যের কেন্দ্রীয় মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে। বর্তমানে কৃষিপণ্যের দাম কম এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর চাপ রয়েছে।

· পরিচালন আয় (Operating Income):

শস্য উৎপাদনকারীদের জন্য ন্যূনতম মূল্য, ভর্তুকিবীমা নীতি জোরদার করা হবে ।

· মজুরি আয় (Wage Income):

কাউন্টি-স্তরের শিল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের মজুরি আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে ।

· সম্পত্তি আয় (Property Income):

অলস পড়ে থাকা গ্রামীণ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এবং কৃষকদের সম্পত্তির অধিকার শক্তিশালী করে তাদের আয়ের নতুন উৎস তৈরি করা হবে ।

· শিল্পায়ন:

কাউন্টি-স্তরের শিল্পগুলোর বিকাশ ঘটানো হবে, যা স্থানীয় সম্পদের ভিত্তিতে অনন্য পণ্য তৈরি করবে। কৃষিগ্রামীণ সংস্কৃতি, পর্যটন এবং ই-কমার্সের সমন্বয় ঘটানো হবে । উদাহরণস্বরূপ, আনহুই প্রদেশের ডাবি পর্বতে উচ্চমূল্যের ঔষধি গাছের চাষ এবং গুয়াংশিতে চা বাগানের সম্প্রসারণ এর অংশ ।

৪. বসবাসযোগ্য ও কর্মবান্ধব গ্রামীণ পরিবেশ গড়ে তোলা (Building a Beautiful and Harmonious Countryside) :

স্থানীয় অবস্থার ভিত্তিতে একটি সুন্দরসুরেলা গ্রাম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে । এদিকে লক্ষ্য রেখে যে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলো হল—

[1] অবকাঠামো ও পরিষেবা উন্নয়ন:

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাটয়লেট আপগ্রেডেশন-সহ গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিবেশ উন্নত করা এবং মৌলিক পরিষেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

[2] পরিকল্পিত উন্নয়ন:

গ্রামীণ স্থানীয় কাঠামোর সমন্বয় ও উন্নত করার মাধ্যমে নগরগ্রামীণ এলাকার সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে ।

পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ :

মূল খাত |মূল লক্ষ্য | ও কার্যক্রম
খাদ্য নিরাপত্তা |উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মিলিয়ন টন বাড়ানো; শস্য উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন টন স্থিতিশীল রাখা।

দারিদ্র্য প্রতিরোধ|সমগ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ; ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে গতিশীলভাবে সহায়তা।

কৃষকের আয় | মূল্য ভর্তুকি, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করে আয়ের তিনটি উৎস সুরক্ষিত করা।

গ্রামীণ পরিবেশ | নগর-গ্রাম সমন্বিত উন্নয়ন; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতিকরণ।

💡 উপসংহার

এভাবে চিনের ‘গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন’-এর পরবর্তী পরিকল্পনা শুধু দারিদ্র্য বিমোচনের অর্জনকে ধরে রাখার জন্য নয়, বরং একটি টেকসইআধুনিক কৃষি কাঠামো গড়ে তোলার জন্য একটি সুচিন্তিত পথপরিক্রমা শুরু করা হয়েছে। এটি প্রযুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগগুলো চিনের সামগ্রিক আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
----------xx----------

মন্তব্যসমূহ

📂 আলী হোসেনের জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলি

হিন্দু কারা? তারা কীভাবে হিন্দু হল?

হিন্দু কারা? কীভাবে তারা হিন্দু হল? যদি কেউ প্রশ্ন করেন, অমিত শাহ হিন্দু হলেন কবে থেকে? অবাক হবেন তাই তো? কিন্তু আমি হবো না। কারণ, তাঁর পদবী বলে দিচ্ছে উনি এদেশীয়ই নন, ইরানি বংশোদ্ভুত। কারণ, ইতিহাস বলছে পারস্যের রাজারা ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এবং ‘শাহ’ শব্দটি পার্শি বা ফার্সি। লালকৃষ্ণ আদবানির নামও শুনেছেন আপনি। মজার কথা হল আদবানি শব্দটিও এদেশীয় নয়। আরবি শব্দ ‘আদবান’ থেকে উদ্ভূত। সুতরাং তাঁর পদবীও বলছে, তিনিও এদেশীয় নন। ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চবর্ণের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মানুষদের, উৎসভূমি হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। তারও আগে ছিল ইউরোপের ককেশাস অঞ্চলে। আসলে এরা (উচ্চবর্ণের মানুষ) কেউই এদেশীয় নয়। তারা নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয়ে তারা গর্ববোধ করতেন। সিন্ধু সভ্যতা পরবর্তীকালে তারা পারস্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ ধরে এদেশে অভিবাসিত হয়েছেন। আর মধ্যযুগে এসে এদেরই উত্তরসূরী ইরানিরা (অমিত শাহের পূর্বপুরুষ) অর্থাৎ পারস্যের কিছু পর্যটক-ঐতিহাসিক, এদেশের আদিম অধিবাসীদের ’হিন্দু’ বলে অভিহিত করেছেন তাদের বিভিন্ন ভ্রমণ বৃত্তান্তে। ...

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন আলী হোসেন  যদি প্রশ্ন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী? মনে হয় অনেকেই ঘাবড়ে যাবেন। কেউ বলবেন, তাঁর বাবা যখন ব্রাহ্ম ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্ম হবেন। যারা লেখাপড়া জানেন না, তারা বলবেন, কেন! উনি তো হিন্দু ছিলেন। আবার কেউ কেউ তথ্য সহযোগে এও বলার চেষ্টা করবেন যে, উনি নাস্তিক ছিলেন। না হলে কেউ বলতে পারেন, ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো?¹ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ভাবনার বিবর্তন  তাহলে সঠিক উত্তরটা কী? আসলে এর কোনোটাই সঠিক উত্তর নয়। চিন্তাশীল মানুষ-মাত্রই সারা জীবন ধরে ভাবতে থাকেন। ভাবতে ভাবতে তাঁর উপলব্ধি এগোতে থাকে ক্রমশঃ প্রগতির পথে। এই সময়কালে জগৎ ও জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একে একে গড়ে তোলেন জীবনদর্শনের নিত্যনতুন পর্ব। তাই এ ধরনের চিন্তাশীল মানুষ আজীবন এক এবং অখণ্ড জীবনদর্শনের বার্তা বহন করেন না। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় তাঁর পথচলার গতিমুখ, গড়ে ওঠে উন্নততর জীবন দর্শন। মানুষ রবীন্দ্রনাথও তাই পাল্টে ফেলেছেন তাঁর জীবন ও ধর্মদর্শন; সময়ের এগিয়ে যাওয়াকে অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথ ও  হিন্দু জাতীয়তাবাদ ১৮৬১ সালের ৭ই মে সোমবার রাত্রি ২টা ৩৮ ...

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি - লিখছেন আলী হোসেন  কপালের লেখন খণ্ডায় কার সাধ্য? জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কিংবা লেখাপড়া জানা-নাজানা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কথাটা মেনে নেয়। জীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাসে কপালের লেখনকে জায়গা করে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং বলা ভালো এব্যাপারে তারা অতিমাত্রায় উদার। মানুষের মনস্তত্বের এ-এক জটিল স্তর বিন্যাস। একই মানুষ বিভিন্ন সময়ে একই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণে ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে। এ রকমই একটি দৃষ্টিকোণ হলো কপাল বা ভাগ্যের ভূমিকাকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে ভাবা। কখনও সে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, আবার কখনও নিজেই ভাগ্যের কাছে নির্দিধায় আত্ম সমর্পন করে। নিজের ব্যার্থতার পিছনে ভাগ্যের অদৃশ্য হাতের কারসাজির কল্পনা করে নিজের ব্যার্থতাকে ঢাকা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। মজার কথা, এক্ষেত্রে মুসলিম মানসের মনস্তত্ত্ব কখনও চেতনমনে আবার কখনও অবচেতন মনে উপরওয়ালাকে (আল্লাহকে) কাঠ গড়ায় তোলে বিনা দ্বিধায়। নির্দিধায় বলে দেয়, উপরওয়ালা রাজি না থাকলে কিছুই করার থাকেনা। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সবই তাঁর (আল...

সীমান্ত আখ্যান, বাঙালির আত্মানুসন্ধানের ডিজিটাল আখ্যান

সময়ের সঙ্গে সমস্যার চরিত্র বদলায়। কিন্তু মুলটা বদলায় না। যদি সে সমস্যা ইচ্ছা করে তৈরি হয়ে থাকে বিশেষ সুবিধা ভোগেই লোভে, তবে তো অন্য কথা চলেই না। স্বনামধন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারের ডকুমেন্টারি ফিল্প 'সীমান্ত আখ্যান' দেখার পর এই উপলব্ধি মাথা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখলাম, দেশ ভাগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যার অবসান হয়নি। শুধু সমস্যার চরিত্রটা পাল্টেছে। এই যে সমস্যা রয়ে গেল, কোন গেল? তার উত্তর ও পাওয়া গেল 'সীমান্ত আখ্যান' এ। আসলে দেশ ভাগ তো দেশের জনগণ চাননি, চেয়েছেন দেশের নেতারা। চেয়েছেন তাঁদের ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত সুবিধাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার নেশায়। আর এই নেশার রসদ যোগান দিতে পারার নিশ্চয়তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে থাকার ওপর। তাই রাজনীতিকরা এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য জনগণকে 'ডিভাইড এন্ড রুল' পলিছি দ্বারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন। এ সমস্যা নতুন না, ব্রিটিশ সরকার এর বীজ রোপণ করে গেছেন, এখন কেউ তার সুফল ভোগ করছে (রাজনীতিকরা) আর কেউ কুফল (জনগন)। 'সীমান্ত আখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দে...

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের ভাগ্যলিপিতে লেখা হয়ে গেছে এই বিখ্যাত প্রবাদটির বিস্তারিত সারাৎসার। একদিকে পাকিস্তান আর অন্যদিকে ভারত – এই দুই প্রতিবেশি দেশের ভুরাজনৈতিক স্বার্থের যাঁতাকলে পড়ে তাদের এই হাল। কিন্তু কেন এমন হল? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না এমন মানুষ ভুভারতে হয়তো বা নেই। কিন্তু সেই জানার মধ্যে রয়েছে বিরাট ধরণের ফাঁক। সেই ফাঁক গলেই ঢুকেছে কাশ্মির ফাইলসের মত বিজেপির রাজনৈতিক ন্যারেটিভ যা তারা বহুকাল ধরে করে চলেছে অন্য আঙ্গিকে। এবার নতুন মাধ্যমে এবং নবরূপে তার আগমন ঘটেছে, যায় নাম সিনেমা বা সেলুলয়েড প্রদর্শনী। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সৌজন্যে অনেক আগেই সফলভাবে তারা এই ন্যারেটিভ দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করে চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। টেলিভিশন সম্প্রচারে কর্পোরেট পুজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যার সূচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রশক্তিকে কুক্ষিগত করতে না পারলে দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব নয়, একথা সাধারণ নিরক্ষর নাগরিক এবং ত...

মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস কী শুধুই ধর্মীয় সংঘাতের ইতিহাস? জেমিনাই এআই-এর সাথে একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক বিতর্ক

মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস কী শুধুই ধর্মীয় সংঘাতের ইতিহাস? জেমিনাই এআই-এর সাথে একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক বিতর্ক ও প্রকৃত সত্যের অনুসন্ধান ভূমিকা : সম্প্রতি আমি ( আলী হোসেন ) গুগলের জেমিনাই এআই (Gemini AI)-এর সাথে ইতিহাস রচনার আধুনিক পদ্ধতি এবং মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মূল্যায়ন নিয়ে একটি দীর্ঘ ও বিতর্কিত আলোচনায় অংশ  নিয়েছিলাম। আলোচনার এক পর্যায়ে এআই-এর প্রথমদিকের কিছু প্রচলিত ও অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যাকে যখন যুক্তি এবং আধুনিক ও সুসংবদ্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি কাঠামোর সামনে দাঁড় করালাম , তখন কীভাবে একটি বড় ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা অন্ধবিন্দু পেরিয়ে আসল সত্যটি বেরিয়ে এলো —তার পুরো বিবরণ পাঠকদের জন্য নিচে হুবহু (সংলাপ আকারে) তুলে ধরা হলো। ইতিহাসকে চেনার জন্য এই আলোচনাটি প্রতিটি ইতিহাসপ্রেমীর মনে নতুন খোরাক জোগাবে। মূল সংলাপ: পাঠক (আলী হোসেন) বনাম জেমিনাই এআই Medieval Indian History - Complete 14 Slides Beyond Religious Conflict ...

শিক্ষা কী, কেন প্রয়োজন এবং কীভাবে অর্জন করা যায়?

শিক্ষা কী, কেন এবং কীভাবে অর্জন করতে হয়? সূচিপত্র : What is education, why it is needed and how to achieve it শিক্ষা কী শিক্ষা হল এক ধরনের অর্জন, যা নিজের ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে নিজে নিজেই নিজের মধ্যে জমা করতে হয়। প্রকৃতি থেকেই সেই অর্জন আমাদের চেতনায় আসে। সেই চেতনাই আমাদের জানিয়ে দেয়, জগৎ ও জীবন পরিচালিত হচ্ছে প্রকৃতির কিছু অলংঘনীয় নিয়ম-নীতি দ্বারা। গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ শক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজে লাগালেই এই নিয়মনীতিগুলো আমাদের আয়ত্বে আসে। এই নিয়ম-নীতিগুলো জানা, বোঝা এবং সেই জানা-বোঝার ওপর ভিত্তি করেই জগৎ ও জীবনকে সর্বোত্তম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার পথ খুঁজে বের করার শক্তি অর্জন করা যায়। এই শক্তিই হল শিক্ষা। এক কথায় : শিক্ষা হল একধরনের সামর্থ বা শক্তি, যা জগত, জীবন ও রাষ্ট্র-পরিচালনার অলঙ্ঘনীয় নিয়মগুলো জানতে, বুঝতে এবং তাকে সফলভাবে প্রয়োগ করতে শেখায়, এবং মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সফল করে তোলে। মনে রাখতে হবে, এই শিক্ষা কখনও কারও মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন হল, শিক্ষা অর্জনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিটা আসলে কী। সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে জানতে হবে, এ...

জল, না পানি : জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয়

জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয় আলী হোসেন  সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে চিত্র শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য পানি শব্দকে বাংলা নয় বলে দাবি করেছেন। বলেছেন, "আমরা কোনোদিন কখনও বাংলা ভাষায় পানি (শব্দটা) ব্যবহার করি না"। শুধু তা-ই নয়, পানি শব্দের ব্যবহারের মধ্যে তিনি 'সাম্প্রদায়িকতার ছাপ'ও দেখতে পেয়েছেন। প্রশ্ন হল - এক, এই ভাবনা কতটা বাংলা ভাষার পক্ষে স্বাস্থ্যকর এবং কতটা 'বাংলা ভাষার ইতিহাস' সম্মত? দুই, জল বা পানি নিয়ে যারা জলঘোলা করছেন তারা কি বাংলাকে ভালোবেসে করছেন? মনে হয় না। কারণ, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা কেউ নিজের সন্তানকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াননি বা পড়ান না। ব্যবহারিক জীবনেও তারা বাংলার ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে বা গান শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, বলা ভালো গর্ববোধ করেন। প্রসংগত মনে রাখা দরকার, বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যারা ভর্তি হয়, তারা অধিকাংশই গরীব ঘরের সন্তান। বলা ভালো, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তারাই বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ, সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর পাশাপাশি, বা...

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন আলী হোসেন বিচার একটি যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। বিচারক কখনই সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না, যদি না এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা ও তার কর্মকর্তারা উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং বিচারককে তা সরবরাহ করতে পারেন। আর বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি শক্তির আধার; তা যার হাতে থাকে, তিনিই বিচারক। এই শক্তি ন্যায়বিচার তখনই দিতে পারে, যখন বিচারক নিরপেক্ষ থাকার সৎ সাহস দেখান এবং সাংবিধানিক আইন এবং তার প্রয়োগ বিষয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তবে তাঁর সফলতা নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনজীবীরা কতটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই তথ্য বিচারকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তার উপর। তাই একজন বিচারক বা বিচার ব্যবস্থা যা বিধান দেয়, তা সব সময় একশ শতাংশ সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হবে - এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো একটি পক্ষ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে ন্যায় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, ...

নিম্নবর্গের মানুষ মার খাচ্ছে কেন

নিম্নবর্গের মানুষ কীভাবে পিছিয়ে পড়েছেন? সমাধান কীভাবে? এদেশের নিম্নবর্গের মানুষ নিজেদের বাঁচাতে যুগ যুগ ধরে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। কখনও বৌদ্ধ (প্রাচীন যুগ), কখনও মুসলমান (মধুযুগ), কিম্বা কখনো খ্রিস্টান (আধুনিক যুগ) হয়েছে। কিন্তু কখনই নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে পাল্টানোর কথা ভাবেনি। পরিবর্তন হচ্ছে অলংঘনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম। যারা এই নিয়ম মেনে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, তারাই লাভবান হয়, টিকে থাকে। “পাল্টে গেলেই জীবন বাড়ে না পাল্টালে নয়, জীবন মানেই এগিয়ে যাওয়া নইলে মৃত্যু হয়” জীবনের এই চরম সত্য তারা অধিকাংশই উপলব্ধি করতে পারেনি। পৃথিবীর যেকোন উন্নত জাতির দিকে তাকান, তারা দ্রুততার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে মেনে নিজেদেরকে পুনর্গঠন করে নিয়েছে। যারা পারেনি বা নেয়নি তারাই মার খাচ্ছে, অতীতেও খেয়েছে। বুদ্ধিমান জাতি নিজের দুর্বলতাকে মেনে নেয় এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময়ের সঙ্গে তাল রেখে নিজেদের চিন্তা এবং চেতনায় পরিবর্তন আনে। খ্রিষ্টান, ইহুদি-সহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জাতি - যারাই এই পরিবর্তন মেনে নিয়েছে তারাই আরও উন্নত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মহানবীর (সঃ) গৌরবময় উত্থান (যা এক ধরণ...