সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চিনের দারিদ্র্য দূরীকরণের মূল নীতি

চিনের দারিদ্র্য দূরীকরণের মূল নীতি এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করে? এর ফলাফল

চীন দারিদ্র্য দূরীকরণে যে নীতি গ্রহণ করে এবং যেভাবে তা বাস্তবায়ন করে, তা সত্যিই অনন্য ও ব্যাপক। চলুন, এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

🇨🇳 চীনের দারিদ্র্য দূরীকরণের নীতি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি :

চীনের দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো একটি দ্বি-স্তরীয় কৌশল: 
  • প্রথমত, চরম দারিদ্র্য দূর করা এবং 
  • দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়া রোধ করে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা।
২০২০ সালে চরম দারিদ্র্য দূর করার পর, চীন সরকার একটি পাঁচ বছরের ক্রান্তিকাল (২০২১-২৫) ঘোষণা করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল 
  • ১) দারিদ্র্য দূরীকরণের অর্জনগুলিকে সুসংহত করা এবং 
  • ২) গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনের সাথে সংযুক্ত করা।
এই লক্ষ্যে গৃহীত প্রধান নীতিগুলো হলো:

১. লক্ষ্যবস্তু ও গতিশীল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (Targeted and Dynamic Monitoring):

চীন একটি জাতীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছে যা দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে শনাক্ত করে। ২০২৫ সালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে শনাক্ত করা হয় এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা হয়েছে । এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।

২. শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি (Industrial Development and Employment):


দারিদ্র্য বিমোচনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
১) প্রতিটি দরিদ্রমুক্ত জেলা এখন তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র ও প্রতিযোগিতামূলক ২-৩টি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গড়ে তুলেছে । যেমন, শাআনসি প্রদেশের জাশুই কাউন্টির কালো ছত্রাক, শানসি প্রদেশের ইউনঝো জেলার পেয়াজ, এবং গানসু প্রদেশের আন্দিং জেলার আলু এখন দেশব্যাপী পরিচিত পণ্যে পরিণত হয়েছে ।
২) দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা জনগোষ্ঠীর ৩ কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে, যা তাদের পরিবারের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি নিশ্চিত করে ।

৩. জনগণকেন্দ্রিক ও উন্নয়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি (People-centered and Development-oriented Approach):

চীনের দর্শন হলো "শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, বরং তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করা" ।
ক) অবকাঠামো উন্নয়ন: 
দরিদ্র এলাকায় ১১ লক্ষ কিলোমিটার পাকা রাস্তা তৈরি বা সংস্কার করা হয়েছে। দরিদ্র এলাকায় গ্রামীণ পাওয়ার গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা ৯৯%-এ পৌঁছেছে। প্রায় ৩৫,০০০ পুনর্বাসন সম্প্রদায় এবং ২.৬৬ মিলিয়ন আবাসন ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে ।
খ) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: 
নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশু যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। প্রজন্মান্তর দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে শিক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে । দরিদ্রমুক্ত জনগণের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান ও পানীয় জলের নিরাপত্তা steadily উন্নত করা হয়েছে ।

৪. মজবুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয় (Strong Financial and Social Safety Net):

ক) অর্থায়ন: 
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে, কেন্দ্রীয় সরকার ৮৫০.৫ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ১৩ ত্রিলিয়ন টাকা) বরাদ্দ করেছে গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনকে সমর্থন করার জন্য, যা আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ৬০% বেশি ।
খ) সামাজিক নিরাপত্তা: 
বিশ্বের বৃহত্তম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে প্রায় ২ কোটি দরিদ্র মানুষ ভাতা ও বিশেষ সহায়তা পাচ্ছে এবং ২.৪ কোটির বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জীবনযাত্রার ভাতা ও সেবা পাচ্ছে ।

✨ ফলাফল: কতটা আশাব্যঞ্জক?

চীনের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির ফলাফল কেবল আশাব্যঞ্জকই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নজিরবিহীন। নিচের ছকটি দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে:
নির্দেশক (Indicator) ফলাফল (Outcome) তাৎপর্য (Significance)

দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা মানুষের কর্মসংস্থান ৩০ লক্ষেরও বেশি (স্থিতিশীল) দরিদ্রমুক্ত পরিবারের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি নিশ্চিত করে, যা টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।

দরিদ্রমুক্ত কাউন্টিতে গ্রামীণ বাসিন্দাদের মাথাপিছু আয় (২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে) ১৩,১৫৮ ইউয়ান (প্রায় ১,৮৫৯ ডলার) এই আয় বৃদ্ধির হার জাতীয় গ্রামীণ গড় আয়ের চেয়ে ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি ।

দারিদ্র্য প্রত্যাবর্তন রোধ ২০২৫ সালে ৭০ লক্ষেরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে শনাক্ত ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও বড় আকারে দারিদ্র্য প্রত্যাবর্তন রোধ করা সম্ভব হয়েছে ।

শিল্পায়ন ৮৩২টি দরিদ্রমুক্ত কাউন্টির প্রতিটি এখন নিজস্ব ২-৩টি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গড়ে তুলেছে এটি স্থানীয় অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করে তুলেছে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির পথ তৈরি করেছে।

💡 উপসংহার: একটি রোল মডেল

চীনের দারিদ্র্য বিমোচন কেবল সংখ্যা কমানোর একটি অঙ্ক নয়; এটি মানব সভ্যতার এক নতুন অধ্যায়। ১৯৭৮ সালে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পর থেকে চীন ৮০ কোটিরও বেশি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে, যা একই সময়ে বৈশ্বিক দারিদ্র্য হ্রাসের ৭০%-এরও বেশি ।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই সাফল্যকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ইকুয়েডরের সাবেক বাণিজ্য প্রতিনিধি হেক্টর ভিলাগ্রান-সেপেদা বলেছেন, "এই মূল্যবান অভিজ্ঞতা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য শিক্ষণীয়" । মালির মন্ত্রী মামু ড্যাফে মনে করেন, "কীভাবে শিল্প উন্নয়ন মানুষের সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে, তা দেখানোর জন্য এই প্রতিবেদন অত্যন্ত মূল্যবান" ।

চীনের এই মডেল প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি, দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ও ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে দারিদ্র্যের মতো জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব। এটি শুধু চীনের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি পথপ্রদর্শক।

চীনের দারিদ্র্য দূরীকরণ নীতির বৈশ্বিক প্রভাব :

চীন শুধু নিজের দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করেনি, বরং তার সাফল্য ও পদ্ধতি অন্যান্য দেশের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

🌍 চীনের বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল:

চীন অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশকে শুধু আর্থিক সহায়তা দেয় না, বরং তাদের টেকসই উন্নয়নের সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। চীনের এই প্রচেষ্টার মূল ভিত্তি হলো বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (Global Development Initiative - GDI) । ২০২১ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে এই উদ্যোগের আওতায় চীন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার উন্নয়ন তহবিল সংগ্রহ করেছে এবং ১,১০০টিরও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে । ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই তহবিল বেড়ে ২৩ বিলিয়ন ডলার এবং প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে ১,৮০০-তে পৌঁছেছে ।

চীনের দর্শন হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আধুনিকায়নের স্রোতে "নিষ্ক্রিয় অনুসারী" না করে সমান অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা ।

🌱 বাস্তব উদাহরণ ও ফলাফল: দেশভিত্তিক সাফল্যের গল্প

চীনের এই সহযোগিতা বিভিন্ন অঞ্চলে এবং দেশে বাস্তব ফল দিচ্ছে। নিচের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো:

দেশ/অঞ্চল প্রকল্প/সহায়তার ধরন ফলাফল

তানজানিয়া : নিবিড় ভুট্টা চাষের প্রদর্শনী প্রকল্প স্থানীয় কৃষকদের প্রতি হেক্টরে ফলন ২-৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক দশক ধরে এই কৌশল ব্যাপকভাবে গৃহীত ও প্রসারিত হয়েছে।

রুয়ান্ডা : জুনকাও (ছত্রাক ঘাস) প্রযুক্তি হস্তান্তর ২০০৬ সাল থেকে এই প্রযুক্তিতে ৩৫,০০০-এরও বেশি পরিবার উপকৃত হয়েছে এবং অনেকে সফল উদ্যোক্তা হয়েছে।

উজবেকিস্তান : ১৪টি অঞ্চলে ১৮টি লক্ষ্যভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প; কৃষি প্রযুক্তি (ড্রোন, ড্রিপ ইরিগেশন) ও প্রশিক্ষণ হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ; তুলা ও গমের উচ্চফলনশীল, লবণসহিষ্ণু জাতের পরীক্ষা চালু হয়েছে।

নামিবিয়া : চীনা কৃষি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা কীটনাশক ব্যবস্থাপনা, পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণ, কম্পোস্ট ও সেচ প্রশিক্ষণ প্রায় ২০০ স্থানীয় কৃষক উপকৃত হয়েছে এবং আঞ্চলিক কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পটি জাতিসংঘের FAO-স্বীকৃত সেরা দারিদ্র্য বিমোচন অনুশীলন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

গ্রেনাডা : কৃষি প্রযুক্তি সহায়তা প্রকল্প (শাকসবজি, ফল, পশুপালন, বাঁশ-বেত, সেচ) ১০০-রও বেশি নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন; ১,১০০-রও বেশি কৃষক প্রশিক্ষিত; কৃষি যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষাগার স্থাপন। প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংক ও FAO-স্বীকৃত সেরা দারিদ্র্য বিমোচন অনুশীলন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

কম্বোডিয়া : বন্ধুত্বপূর্ণ গ্রাম প্রকল্প; চীন-আসিয়ান গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন পরিকল্পনা দূরবর্তী তানর্ন গ্রামে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা ; কম্বোডিয়ায় চীনের সহায়তায় ডিটারজেন্ট ফ্যাক্টরি স্থাপন ।
মিয়ানমার ও লাওস : পূর্ব এশিয়া দারিদ্র্য বিমোচন সহযোগিতা পাইলট প্রকল্প গ্রামীণ সম্প্রদায়ে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা।

আফ্রিকা (সামগ্রিকভাবে) : পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি স্কুল, কৃষি সহযোগিতা অঞ্চল, ঘাস দিয়ে মাশরুম চাষ, আফ্রিকান সিডিসির সদর দপ্তর নির্মাণ খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।

লাতিন আমেরিকা : কৃষি প্রযুক্তি প্রদর্শনী কেন্দ্র নির্মাণ স্থানীয় কৃষি উৎপাদনশীলতা ও জ্ঞান বৃদ্ধি।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল : অবকাঠামো, কৃষি ও চিকিৎসা খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রকল্প জীবনযাত্রার মান ও সেবার উন্নতি।
শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা তহবিলের মাধ্যমে সহায়তা ১৮০টিরও বেশি দেশের ৪০০,০০০-এর বেশি পেশাজীবীকে প্রশিক্ষণ ।

🤝 জ্ঞান ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম

চীন শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নই নয়, জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময়ের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামোও তৈরি করেছে।

· প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা: 
চীন দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন বিষয়ক সেমিনারের মাধ্যমে ১৮০টিরও বেশি দেশের ৪০০,০০০-এর বেশি পেশাজীবীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যা অন্যান্য দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে । উজবেকিস্তানের হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা চীনে এই ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ।
· কৌশলগত ফোরাম: 
২০২৫ সালের নভেম্বরে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সাউথ মডার্নাইজেশন ফোরামে চীনের দারিদ্র্য বিমোচন অনুশীলন এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা চীনের "জনগণকেন্দ্রিক ও লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল" কে নিজেদের দেশের জন্য মূল্যবান জ্ঞান হিসেবে উল্লেখ করেন ।
· জাতিসংঘের সাথে অংশীদারিত্ব: 
চীন-ইউএন শান্তি ও উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে প্রায় ৫০টি দেশে ১০০টিরও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়তা করছে । আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (IFAD) সাথে অংশীদারিত্বে মোট ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের ৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা ৪.৬ মিলিয়নেরও বেশি গ্রামীণ পরিবারকে সরাসরি উপকৃত করেছে ।

💡 উপসংহার: একটি টেকসই ও অনুপ্রেরণীয় মডেল :

চীনের এই সহযোগিতা "প্যাসিভ ব্লাড ট্রান্সফিউশন" (শুধু সাহায্য দেওয়া) নয়, বরং "অ্যাকটিভ ব্লাড মেকিং" (আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সক্ষমতা তৈরি) এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ । চীনের "লক্ষ্যভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন" নীতি, কৃষি প্রযুক্তি, ডিজিটাল সহায়তা ও পরিকাঠামো উন্নয়নের মডেল বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোর জন্য একটি অভিযোজিত ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে ।

এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, চীনের দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য কেবল একটি জাতীয় অর্জন নয়, এটি এখন একটি বৈশ্বিক পাবলিক গুড-এ পরিণত হয়েছে, যা উন্নয়নশীল বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে অনুপ্রেরণা ও ব্যবহারিক সহায়তা দিচ্ছে।
----------xx----------- 

চীনের "গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন"-এর পরবর্তী পরিকল্পনা

চীনের "গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন"-এর পরবর্তী পরিকল্পনা অত্যন্ত সুসংহত এবং দূরদর্শী। ২০২৬ সালটি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০২৬-৩০) প্রথম বর্ষ এবং দারিদ্র্য বিমোচনের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবর্তনকাল শেষ হওয়ার পর প্রথম বছর । এই সময়ে গৃহীত মূল পরিকল্পনাগুলো ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত "নং ১ কেন্দ্রীয় দলিল" এবং সরকারি কাজের প্রতিবেদনের খসড়ায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে ।

পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সামগ্রিক গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং কৃষি ও গ্রামীণ আধুনিকায়নকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া । নিচে এই পরিকল্পনার মূল দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা (Strengthening Food Security) :

এটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। চীনের খাদ্য সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদী চাপের মধ্যে রয়েছে বলে দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে।

· উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা: 

সরকার ৫০ বিলিয়ন মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে । শস্য উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন (প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন জিন) স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ।

· প্রযুক্তির ব্যবহার: 

কৃষি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে উচ্চফলনশীল বীজ ও উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো । "কৃষিতে নতুন মানসম্পন্ন উৎপাদন শক্তি" গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং কৃষি রোবটের ব্যবহার ।

· জমি সুরক্ষা: 

মোট আবাদি জমির "লাল রেখা" বজায় রাখা এবং উর্বর কালো মাটি রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে ।

২. দারিদ্র্য প্রত্যাবর্তন রোধে নিয়মিত ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা (Regular and Targeted Assistance) :

পাঁচ বছরের ক্রান্তিকাল শেষে, দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম এখন একটি নতুন, আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই ধাপে প্রবেশ করছে।

· গতিশীল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা: 
একটি আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে যা দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা সমগ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে কভার করবে । ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে এবং একবার ঝুঁকি কেটে গেলে তাদেরকে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত না রেখে কর্মসূচি থেকে গতিশীলভাবে বের করে আনা হবে ।
· উন্নয়নমূলক সহায়তা: 
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দরিদ্রমুক্ত জনগোষ্ঠীকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে ।
· অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য সহায়তা: 
জাতীয় গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনের জন্য নির্বাচিত ১৬০টি কাউন্টি-সহ অনুন্নত অঞ্চলগুলো অর্থ, জমি, জনবল ও জনসেবায় বিশেষ সহায়তা পাবে ।

৩. কৃষকের আয় স্থিতিশীল বৃদ্ধি নিশ্চিত করা (Promoting Steady Income Growth for Farmers) :

কৃষকদের আয় বৃদ্ধিকে গ্রামীণ কাজের সাফল্যের কেন্দ্রীয় মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে । বর্তমানে কৃষিপণ্যের দাম কম এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর চাপ রয়েছে ।
· পরিচালন আয় (Operating Income): 
শস্য উৎপাদনকারীদের জন্য ন্যূনতম মূল্য, ভর্তুকি ও বীমা নীতি জোরদার করা হবে ।
· মজুরি আয় (Wage Income): 
কাউন্টি-স্তরের শিল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের মজুরি আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে ।
· সম্পত্তি আয় (Property Income): 
অলস পড়ে থাকা গ্রামীণ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এবং কৃষকদের সম্পত্তির অধিকার শক্তিশালী করে তাদের আয়ের নতুন উৎস তৈরি করা হবে ।
· শিল্পায়ন: 
কাউন্টি-স্তরের শিল্পগুলোর বিকাশ ঘটানো হবে, যা স্থানীয় সম্পদের ভিত্তিতে অনন্য পণ্য তৈরি করবে। কৃষি ও গ্রামীণ সংস্কৃতি, পর্যটন এবং ই-কমার্সের সমন্বয় ঘটানো হবে । উদাহরণস্বরূপ, আনহুই প্রদেশের ডাবি পর্বতে উচ্চমূল্যের ঔষধি গাছের চাষ এবং গুয়াংশিতে চা বাগানের সম্প্রসারণ এর অংশ ।

৪. বসবাসযোগ্য ও কর্মবান্ধব গ্রামীণ পরিবেশ গড়ে তোলা (Building a Beautiful and Harmonious Countryside) :

স্থানীয় অবস্থার ভিত্তিতে একটি সুন্দর ও সুরেলা গ্রাম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে ।

· অবকাঠামো ও পরিষেবা: 
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টয়লেট আপগ্রেডেশন-সহ গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিবেশ উন্নত করা এবং মৌলিক পরিষেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে ।
· পরিকল্পিত উন্নয়ন: 
গ্রামীণ স্থানিক কাঠামো সমন্বয় ও উন্নত করার মাধ্যমে নগর ও গ্রামীণ এলাকার সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে ।

পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ :

মূল খাত মূল লক্ষ্য ও কার্যক্রম
খাদ্য নিরাপত্তা উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মিলিয়ন টন বাড়ানো; শস্য উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন টন স্থিতিশীল রাখা।
দারিদ্র্য প্রতিরোধ সমগ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ; ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে গতিশীলভাবে সহায়তা।
কৃষকের আয় মূল্য ভর্তুকি, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করে আয়ের তিনটি উৎস সুরক্ষিত করা।
গ্রামীণ পরিবেশ নগর-গ্রাম সমন্বিত উন্নয়ন; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতিকরণ।

💡 উপসংহার

চীনের "গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন"-এর পরবর্তী পরিকল্পনা শুধু দারিদ্র্য বিমোচনের অর্জনকে ধরে রাখার জন্য নয়, বরং একটি টেকসই ও আধুনিক কৃষি কাঠামো গড়ে তোলার জন্য একটি সুচিন্তিত পথপরিক্রমা। এটি প্রযুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা। ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগগুলো চীনের সামগ্রিক আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে বলে আশা করা হচ্ছে ।
----------xx----------

মন্তব্যসমূহ

📂 আলী হোসেনের জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলি

হিন্দু কারা? তারা কীভাবে হিন্দু হল?

হিন্দু কারা? কীভাবে তারা হিন্দু হল? যদি কেউ প্রশ্ন করেন, অমিত শাহ হিন্দু হলেন কবে থেকে? অবাক হবেন তাই তো? কিন্তু আমি হবো না। কারণ, তাঁর পদবী বলে দিচ্ছে উনি এদেশীয়ই নন, ইরানি বংশোদ্ভুত। কারণ, ইতিহাস বলছে পারস্যের রাজারা ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এবং ‘শাহ’ শব্দটি পার্শি বা ফার্সি। লালকৃষ্ণ আদবানির নামও শুনেছেন আপনি। মজার কথা হল আদবানি শব্দটিও এদেশীয় নয়। আরবি শব্দ ‘আদবান’ থেকে উদ্ভূত। সুতরাং তাঁর পদবীও বলছে, তিনিও এদেশীয় নন। ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চবর্ণের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মানুষদের, উৎসভূমি হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। তারও আগে ছিল ইউরোপের ককেশাস অঞ্চলে। আসলে এরা (উচ্চবর্ণের মানুষ) কেউই এদেশীয় নয়। তারা নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয়ে তারা গর্ববোধ করতেন। সিন্ধু সভ্যতা পরবর্তীকালে তারা পারস্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ ধরে এদেশে অভিবাসিত হয়েছেন। আর মধ্যযুগে এসে এদেরই উত্তরসূরী ইরানিরা (অমিত শাহের পূর্বপুরুষ) অর্থাৎ পারস্যের কিছু পর্যটক-ঐতিহাসিক, এদেশের আদিম অধিবাসীদের ’হিন্দু’ বলে অভিহিত করেছেন তাদের বিভিন্ন ভ্রমণ বৃত্তান্তে। ...

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন আলী হোসেন  যদি প্রশ্ন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী? মনে হয় অনেকেই ঘাবড়ে যাবেন। কেউ বলবেন, তাঁর বাবা যখন ব্রাহ্ম ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্ম হবেন। যারা লেখাপড়া জানেন না, তারা বলবেন, কেন! উনি তো হিন্দু ছিলেন। আবার কেউ কেউ তথ্য সহযোগে এও বলার চেষ্টা করবেন যে, উনি নাস্তিক ছিলেন। না হলে কেউ বলতে পারেন, ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো?¹ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ভাবনার বিবর্তন  তাহলে সঠিক উত্তরটা কী? আসলে এর কোনোটাই সঠিক উত্তর নয়। চিন্তাশীল মানুষ-মাত্রই সারা জীবন ধরে ভাবতে থাকেন। ভাবতে ভাবতে তাঁর উপলব্ধি এগোতে থাকে ক্রমশঃ প্রগতির পথে। এই সময়কালে জগৎ ও জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একে একে গড়ে তোলেন জীবনদর্শনের নিত্যনতুন পর্ব। তাই এ ধরনের চিন্তাশীল মানুষ আজীবন এক এবং অখণ্ড জীবনদর্শনের বার্তা বহন করেন না। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় তাঁর পথচলার গতিমুখ, গড়ে ওঠে উন্নততর জীবন দর্শন। মানুষ রবীন্দ্রনাথও তাই পাল্টে ফেলেছেন তাঁর জীবন ও ধর্মদর্শন; সময়ের এগিয়ে যাওয়াকে অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথ ও  হিন্দু জাতীয়তাবাদ ১৮৬১ সালের ৭ই মে সোমবার রাত্রি ২টা ৩৮ ...

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি - লিখছেন আলী হোসেন  কপালের লেখন খণ্ডায় কার সাধ্য? জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কিংবা লেখাপড়া জানা-নাজানা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কথাটা মেনে নেয়। জীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাসে কপালের লেখনকে জায়গা করে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং বলা ভালো এব্যাপারে তারা অতিমাত্রায় উদার। মানুষের মনস্তত্বের এ-এক জটিল স্তর বিন্যাস। একই মানুষ বিভিন্ন সময়ে একই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণে ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে। এ রকমই একটি দৃষ্টিকোণ হলো কপাল বা ভাগ্যের ভূমিকাকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে ভাবা। কখনও সে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, আবার কখনও নিজেই ভাগ্যের কাছে নির্দিধায় আত্ম সমর্পন করে। নিজের ব্যার্থতার পিছনে ভাগ্যের অদৃশ্য হাতের কারসাজির কল্পনা করে নিজের ব্যার্থতাকে ঢাকা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। মজার কথা, এক্ষেত্রে মুসলিম মানসের মনস্তত্ত্ব কখনও চেতনমনে আবার কখনও অবচেতন মনে উপরওয়ালাকে (আল্লাহকে) কাঠ গড়ায় তোলে বিনা দ্বিধায়। নির্দিধায় বলে দেয়, উপরওয়ালা রাজি না থাকলে কিছুই করার থাকেনা। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সবই তাঁর (আল...

সীমান্ত আখ্যান, বাঙালির আত্মানুসন্ধানের ডিজিটাল আখ্যান

সময়ের সঙ্গে সমস্যার চরিত্র বদলায়। কিন্তু মুলটা বদলায় না। যদি সে সমস্যা ইচ্ছা করে তৈরি হয়ে থাকে বিশেষ সুবিধা ভোগেই লোভে, তবে তো অন্য কথা চলেই না। স্বনামধন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারের ডকুমেন্টারি ফিল্প 'সীমান্ত আখ্যান' দেখার পর এই উপলব্ধি মাথা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখলাম, দেশ ভাগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যার অবসান হয়নি। শুধু সমস্যার চরিত্রটা পাল্টেছে। এই যে সমস্যা রয়ে গেল, কোন গেল? তার উত্তর ও পাওয়া গেল 'সীমান্ত আখ্যান' এ। আসলে দেশ ভাগ তো দেশের জনগণ চাননি, চেয়েছেন দেশের নেতারা। চেয়েছেন তাঁদের ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত সুবিধাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার নেশায়। আর এই নেশার রসদ যোগান দিতে পারার নিশ্চয়তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে থাকার ওপর। তাই রাজনীতিকরা এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য জনগণকে 'ডিভাইড এন্ড রুল' পলিছি দ্বারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন। এ সমস্যা নতুন না, ব্রিটিশ সরকার এর বীজ রোপণ করে গেছেন, এখন কেউ তার সুফল ভোগ করছে (রাজনীতিকরা) আর কেউ কুফল (জনগন)। 'সীমান্ত আখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দে...

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের ভাগ্যলিপিতে লেখা হয়ে গেছে এই বিখ্যাত প্রবাদটির বিস্তারিত সারাৎসার। একদিকে পাকিস্তান আর অন্যদিকে ভারত – এই দুই প্রতিবেশি দেশের ভুরাজনৈতিক স্বার্থের যাঁতাকলে পড়ে তাদের এই হাল। কিন্তু কেন এমন হল? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না এমন মানুষ ভুভারতে হয়তো বা নেই। কিন্তু সেই জানার মধ্যে রয়েছে বিরাট ধরণের ফাঁক। সেই ফাঁক গলেই ঢুকেছে কাশ্মির ফাইলসের মত বিজেপির রাজনৈতিক ন্যারেটিভ যা তারা বহুকাল ধরে করে চলেছে অন্য আঙ্গিকে। এবার নতুন মাধ্যমে এবং নবরূপে তার আগমন ঘটেছে, যায় নাম সিনেমা বা সেলুলয়েড প্রদর্শনী। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সৌজন্যে অনেক আগেই সফলভাবে তারা এই ন্যারেটিভ দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করে চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। টেলিভিশন সম্প্রচারে কর্পোরেট পুজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যার সূচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রশক্তিকে কুক্ষিগত করতে না পারলে দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব নয়, একথা সাধারণ নিরক্ষর নাগরিক এবং ত...

শিক্ষা কী, কেন প্রয়োজন এবং কীভাবে অর্জন করা যায়?

শিক্ষা কী, কেন এবং কীভাবে অর্জন করতে হয়? সূচিপত্র : What is education, why it is needed and how to achieve it শিক্ষা কী শিক্ষা হল এক ধরনের অর্জন, যা নিজের ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে নিজে নিজেই নিজের মধ্যে জমা করতে হয়। প্রকৃতি থেকেই সেই অর্জন আমাদের চেতনায় আসে। সেই চেতনাই আমাদের জানিয়ে দেয়, জগৎ ও জীবন পরিচালিত হয় প্রকৃতির কিছু অলংঘনীয় নিয়ম-নীতির দ্বারা। গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ শক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজে লাগালেই এই নিয়মনীতিগুলো আমাদের আয়ত্বে আসে। এই নিয়ম-নীতিগুলো জানা এবং সেই জানার ওপর ভিত্তি করেই জগৎ ও জীবনকে সর্বোত্তম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার পথ খুঁজে বের করার শক্তি অর্জনই শিক্ষা। মনে রাখতে হবে, এই শিক্ষা কখনও কারও মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন হল, শিক্ষা অর্জনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিটা আসলে কী। সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে জানতে হবে, এই শিক্ষার সূচনা হয় কখন এবং কীভাবে? শিক্ষার সূচনা কখন হয় : এই অর্জনের সূচনা হয় মাতৃগর্ভে এবং তা প্রাকৃতিক ভাবেই। প্রকৃতির দেওয়া কিছু সহজাত শিক্ষাকে অবলম্বন করেই তার সূচনা। এই সহজাত শিক্ষাকে অবলম্বন করেই মানুষ তার পরবর্তী প...

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন আলী হোসেন বিচার একটি যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। বিচারক কখনই সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না, যদি না এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা ও তার কর্মকর্তারা উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং বিচারককে তা সরবরাহ করতে পারেন। আর বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি শক্তির আধার; তা যার হাতে থাকে, তিনিই বিচারক। এই শক্তি ন্যায়বিচার তখনই দিতে পারে, যখন বিচারক নিরপেক্ষ থাকার সৎ সাহস দেখান এবং সাংবিধানিক আইন এবং তার প্রয়োগ বিষয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তবে তাঁর সফলতা নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনজীবীরা কতটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই তথ্য বিচারকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তার উপর। তাই একজন বিচারক বা বিচার ব্যবস্থা যা বিধান দেয়, তা সব সময় একশ শতাংশ সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হবে - এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো একটি পক্ষ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে ন্যায় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, ...

জল, না পানি : জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয়

জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয় আলী হোসেন  সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে চিত্র শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য পানি শব্দকে বাংলা নয় বলে দাবি করেছেন। বলেছেন, "আমরা কোনোদিন কখনও বাংলা ভাষায় পানি (শব্দটা) ব্যবহার করি না"। শুধু তা-ই নয়, পানি শব্দের ব্যবহারের মধ্যে তিনি 'সাম্প্রদায়িকতার ছাপ'ও দেখতে পেয়েছেন। প্রশ্ন হল - এক, এই ভাবনা কতটা বাংলা ভাষার পক্ষে স্বাস্থ্যকর এবং কতটা 'বাংলা ভাষার ইতিহাস' সম্মত? দুই, জল বা পানি নিয়ে যারা জলঘোলা করছেন তারা কি বাংলাকে ভালোবেসে করছেন? মনে হয় না। কারণ, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা কেউ নিজের সন্তানকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াননি বা পড়ান না। ব্যবহারিক জীবনেও তারা বাংলার ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে বা গান শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, বলা ভালো গর্ববোধ করেন। প্রসংগত মনে রাখা দরকার, বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যারা ভর্তি হয়, তারা অধিকাংশই গরীব ঘরের সন্তান। বলা ভালো, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তারাই বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ, সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর পাশাপাশি, বা...

নিম্নবর্গের মানুষ মার খাচ্ছে কেন

নিম্নবর্গের মানুষ কীভাবে পিছিয়ে পড়েছেন? সমাধান কীভাবে? এদেশের নিম্নবর্গের মানুষ নিজেদের বাঁচাতে যুগ যুগ ধরে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। কখনও বৌদ্ধ (প্রাচীন যুগ), কখনও মুসলমান (মধুযুগ), কিম্বা কখনো খ্রিস্টান (আধুনিক যুগ) হয়েছে। কিন্তু কখনই নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে পাল্টানোর কথা ভাবেনি। পরিবর্তন হচ্ছে অলংঘনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম। যারা এই নিয়ম মেনে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, তারাই লাভবান হয়, টিকে থাকে। “পাল্টে গেলেই জীবন বাড়ে না পাল্টালে নয়, জীবন মানেই এগিয়ে যাওয়া নইলে মৃত্যু হয়” জীবনের এই চরম সত্য তারা অধিকাংশই উপলব্ধি করতে পারেনি। পৃথিবীর যেকোন উন্নত জাতির দিকে তাকান, তারা দ্রুততার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে মেনে নিজেদেরকে পুনর্গঠন করে নিয়েছে। যারা পারেনি বা নেয়নি তারাই মার খাচ্ছে, অতীতেও খেয়েছে। বুদ্ধিমান জাতি নিজের দুর্বলতাকে মেনে নেয় এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময়ের সঙ্গে তাল রেখে নিজেদের চিন্তা এবং চেতনায় পরিবর্তন আনে। খ্রিষ্টান, ইহুদি-সহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জাতি - যারাই এই পরিবর্তন মেনে নিয়েছে তারাই আরও উন্নত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মহানবীর (সঃ) গৌরবময় উত্থান (যা এক ধরণ...

আধুনিক মিডিয়া : কর্পোরেট পুঁজির (পুঁজিপতিদের) তোতাপাখি

গোদি মিডিয়া : কর্পোরেট পুঁজির তোতাপাখি পশ্চিমী মিডিয়াকে 'ইসরাইল সরকারের তোতাপাখি' নামে পরিচয় দেওয়া হয় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মিডিয়া হাউজের পক্ষ থেকে। সম্প্রতি একইভাবে ভারতীয় কর্পোরেট মিডিয়া ভারত সরকার তথা 'কর্পোরেট পুঁজির  তোতাপাখি' হিসাবে পরিচয় পাচ্ছে, যাকে নিন্দুকেরা 'গোদী মিডিয়া' নামে অভিহিত করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা সম্পর্কে ইসরাইল যা বলে, ইউরোপ ও আমেরিকার মিডিয়া, তোতা পাখির মতো তা-ই প্রচার করে। সাংবাদিকতার প্রধান প্রধান শর্তগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরাইলের দেওয়া তথ্যই তারা প্রচার করে অন্ধ ও নির্লজ্জভাবে। ভারতের ক্ষেত্রেও করপোরেট মিডিয়া বর্তমানে সেটাই করছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ, নত মস্তকে ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য বিনা বিচারে প্রচার করে চলেছে অধিকাংশ মিডিয়া হাউজ।  অর্থাৎ তাদের সম্প্রচারিত খবরের বড় অংশই হয় নিয়ন্ত্রিত অথবা কখনও কখনও অসত্য - এমন দাবিও করা হয়।  আসলে সিংহভাগ মিডিয়ার মালিক হচ্ছেন এক-একজন  করপোরেট পুঁজির মালিক বা পুঁজিপতি। এরা কি কখনও নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় - এমন খবর, তথ্য বা তত্ত্ব প্রচার করবে? করবে না, করেও না। আর এ...