সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পরোপকার ও স্বার্থপরতা কীভাবে মানব সভ্যতা গঠন করেছে? | Altruism vs Selfishness in Human Civilization

পরোপকার বা নিঃস্বার্থ কল্যাণকামিতা (Altruism) এবং স্বার্থপরতা মানব সভ্যতার উপর কী প্রভাব ফেলেছে?

A classical oil painting style image of a set of old-fashioned balance scales. On one scale pan rests a human heart, and on the other rests a Roman gold coin. The scales are perfectly balanced. The background shows an ancient, inscribed stone wall in a dimly lit cave, with a candle burning below the scales. The composition represents the balance between altruism (heart) and selfishness (wealth).
পরোপকার (হৃদয়) ও আত্মস্বার্থ (সম্পদ)—মানব সভ্যতার সূক্ষ্ম ভারসাম্য।

Altruism vs. Selfishness: How Evolutionary Biology and Economics Shaped Human Civilization

মানব সভ্যতার বিকাশ ও সমাজ গঠনের ইতিহাস মূলত দুটি বিপরীতমুখী চালিকাশক্তির টানাপোড়েনের ফসল—একটি পরোপকার বা নিঃস্বার্থ কল্যাণকামিতা (Altruism) এবং অন্যটি স্বার্থপরতা বা আত্মকেন্দ্রিকতা (Self-interest/Selfishness)।

জীববিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব এবং ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই দুই প্রবৃত্তি সভ্যতার গঠনে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে, তা কয়েকটি প্রধান কোণ থেকে দেখা যাক :

১. পরোপকারের প্রভাব: সভ্যতার আসল ভিত্তি

একটি বিখ্যাত গল্পে কথিত আছে, নৃবিজ্ঞানী মার্গারেট মিডকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “মানব সভ্যতার প্রথম চিহ্ন কী?” প্রশ্নকর্তা হয়তো ভেবেছিলেন কোনো প্রাচীন পাথরের হাতিয়ার বা অস্ত্রের কথা বলবেন নৃবিজ্ঞানী মিড। কিন্তু মিড নাকি উত্তর দিয়েছিলেন—একটি জোড়ালাগা ভাঙা উরুর হাড়। বন্যজগতে কোনো প্রাণীর পা ভাঙলে তার মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত, কারণ, সে শিকার করতে বা শিকারির হাত থেকে পালাতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়ে। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগের একটি ফসিলে দেখা যায়, সেই ভাঙা হাড় জোড়া লেগে গিয়েছিল। এর একটাই অর্থ—আহত ব্যক্তিকে অন্য কেউ দীর্ঘদিন ধরে আগলে রেখেছিল, ক্ষতের সেবা করেছিল, নিরাপত্তা দিয়েছিল এবং তিনি তার নিজের খাবার ভাগ করে তাকে খাইয়েছিল। এই নিঃস্বার্থ সহযোগিতা, নিজের লাভের চিন্তা না করে অন্যের প্রাণ বাঁচানোর এই গুণই মানব সভ্যতার প্রথম ও প্রকৃত ভিত্তি।

সামাজিক সংহতি ও নিরাপত্তা : 

আদিম যুগে কেবল স্বার্থপরতা থাকলে মানুষ দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যেত। একা শিকার করার চেয়ে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করা এবং অন্যের বিপদে এগিয়ে আসার নিঃস্বার্থ মানসিকতাই সমাজ, গোত্র ও রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।

নৈতিকতা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশ : 

শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, মানবাধিকার, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তা—এগুলোর মূল ভিত্তি হলো নিঃস্বার্থ কল্যাণকামিতা। অন্যের কষ্ট অনুধাবন করার (Empathy) ক্ষমতা না থাকলে কোনো আইন বা বিচারব্যবস্থা টিকে থাকতে পারত না।

জ্ঞান ও সংস্কৃতির হস্তান্তর:

যখন কোনো বিজ্ঞানী, দার্শনিক বা শিল্পী নিজের ব্যক্তিগত লাভের তোয়াক্কা না করে মানবজাতির কল্যাণে আবিষ্কার বা জ্ঞান বিতরণ করেন, তখন সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতি ঘটে।

২. স্বার্থপরতার প্রভাব: উদ্ভাবন বনাম ধ্বংসের দ্বন্দ্ব

স্বার্থপরতার দুটি রূপ রয়েছে: একটি হলো স্বাভাবিক আত্মরক্ষা ও আত্মউন্নয়ন (Self-interest), যা প্রগতির জ্বালানি; অন্যটি হলো উগ্র স্বার্থপরতা (Unbridled Selfishness), যা সংঘাতের উৎস।

ইতিবাচক দিক (প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবন) :

অর্থনৈতিক গতিশীলতা : 

অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের মতে, মানুষের নিজস্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা বাজার ও বাণিজ্যকে সচল রাখে। একজন রুটি বিক্রেতা মানবসেবার জন্য নয়, নিজের রুজি-রোজগারের স্বার্থেই রুটি বানায়। কিন্তু তার এই স্বার্থপরতার ফলেই সমাজ প্রয়োজনীয় খাদ্য পায়।

প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন: 

নিজের জীবনমান উন্নত করার এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা মানুষকে নতুন প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও অবকাঠামো উদ্ভাবনে উৎসাহিত করেছে।

নেতিবাচক দিক (ধ্বংস ও শোষণ) :

সংঘাত ও যুদ্ধ: যখন ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থপরতা সীমাহীন হয়ে পড়ে, তখন তা সাম্রাজ্যবাদ, দাসপ্রথা, উপনিবেশ স্থাপন এবং যুদ্ধের জন্ম দেয়।
সামাজিক বৈষম্য: সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন এবং উগ্র পুঁজিবাদ স্বার্থপরতারই ফসল, যা সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে গভীর খাদ তৈরি করে।
পরিবেশ বিপর্যয়: প্রকৃতিকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে শোষণ করার স্বার্থপর মনোভাবের কারণেই আজ মানবজাতি জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।

📘 সংক্ষেপে দুই শক্তির তুলনা :

ক্ষেত্র পরোপকার (Altruism) স্বার্থপরতা (Selfishness / Self-interest)
সামাজিক বন্ধন আস্থার পরিবেশ তৈরি করে, সমাজকে একসূত্রে বাঁধে। সামাজিক আস্থা বিনষ্ট করে, একা করে ফেলে।
বিকাশের ধরন দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও সার্বিক কল্যাণ আনে। সাময়িক অগ্রগতি বা একক সমৃদ্ধি আনে।
চলক (Driver) সহমর্মিতা, বিচারবোধ ও যৌথ দায়িত্ব। প্রতিযোগিতা, ভয় ও ব্যক্তিগত লাভের হিসাব।

পরোপকার (Altruism) ও স্বার্থপরতা (Selfishness / Self-interest) পার্থক্য

স্বার্থপরতা বা আত্মরক্ষা মানুষকে টিকিয়ে রাখার এবং প্রতিযোগিতা করার শক্তি দিয়েছে, কিন্তু পরোপকার বা নিঃস্বার্থ কল্যাণকামিতাই মানুষকে 'মানুষ' বানিয়ে সমাজ গঠন করতে শিখিয়েছে। পরোপকার ছাড়া স্বার্থপরতা সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, আর ব্যক্তিগত স্বার্থ বা প্রতিযোগিতা ছাড়া পরোপকার অনেক সময় স্থবিরতা তৈরি করে। সভ্যতার টিকে থাকা নির্ভর করে এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর।

৩. বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্ব ও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পরোপকার (Altruism)

চার্লস ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব (Natural Selection) অনুযায়ী, যে জীব নিজের বেঁচে থাকা ও বংশবৃদ্ধিতে সেরা, কেবল তারাই টিকে থাকে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষের পরম স্বার্থপর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃতিতে এবং বিশেষ করে মানবসমাজে নিঃস্বার্থ পরোপকারের অগণিত প্রমাণ মেলে।

বিবর্তনীয় মনস্তাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীরা চারটি প্রধান তত্ত্বের মাধ্যমে এই বৈপরীত্যের সমাধান করেছেন:

ক. জ্ঞাতি নির্বাচন (Kin Selection) ও হ্যামিল্টনের নিয়ম

১৯৬৪ সালে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম ডি. হ্যামিল্টন (W. D. Hamilton) দেখান যে, জীব কেবল নিজের জন্য নয়, বরং নিজের জিনের (Gene) সফলতার জন্য কাজ করে। একজন ব্যক্তি যখন নিজের রক্ত সম্পর্কিত স্বজনদের (ভাই, বোন, সন্তান) বাঁচানোর জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, তখন পরোক্ষভাবে তার নিজের জিনই বংশপরম্পরায় টিকে যায়।

হ্যামিল্টন এটি গাণিতিক সূত্রের সাহায্যে প্রকাশ করেন, যা Hamilton's Rule নামে পরিচিত:

rB > C

r = দুটি জীবের মধ্যে রক্তের বা জিনগত আত্মীয়তার অনুপাত (Coefficient of relatedness)।
B = পরোপকারের ফলে গ্রহীতার প্রাপ্ত সুবিধা (Benefit to recipient)।
C = দাতার নিজস্ব জীবন বা সম্পদের ঝুঁকি / ক্ষতি (Cost to altruist)।

যখন দাতার ত্যাগের মান (C) গ্রহীতার প্রাপ্ত সুবিধা (B) এবং আত্মীয়তার অনুপাতের (r) গুণফলের চেয়ে কম হয়, তখন বিবর্তনের নিয়মে পরোপকার লাভজনক হয়ে ওঠে। [১]

খ. পারস্পরিক পরোপকার (Reciprocal Altruism)

রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষ কেন অপরিচিতদের সাহায্য করে? ১৯৭১ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট ট্রাইভার্স (Robert Trivers) এই ব্যাখ্যা দেন। তিনি দেখান, ভবিষ্যতে প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশায় মানুষ অপরিচিত মানুষের সঙ্গেও পরোপকারী আচরণ করে।

সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ মনে রাখে— আজ আমি তোমাকে বিপদ থেকে বাঁচালে, কাল তুমি আমাকে বাঁচাবে। এটিই সামাজিক ট্রাস্ট বা আস্থার জন্ম দিয়েছে। [২]

গ. ‘স্বার্থপর জিন’ তত্ত্ব (The Selfish Gene)

১৯৭৬ সালে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স (Richard Dawkins) তাঁর যুগান্তকারী The Selfish Gene বইতে বিষয়টি আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। ডকিন্সের মতে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের আসল একক ব্যক্তি জীব নয়, বরং ‘জিন’

জীবদেহ হলো জিনের টিকে থাকার একটি সাময়িক যান বা সারভাইভাল মেশিন। জিন নিজের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের স্বার্থেই মানুষ বা প্রাণীর ভেতরে অন্যকে সাহায্য করার মতো পরোপকারী অনুভূতি ও আবেগ তৈরি করে। [৩]

ঘ. বহুমাত্রিক বা দলগত নির্বাচন (Multi-level Selection)

বিখ্যাত সমাজ-জীববিজ্ঞানী ই. ও. উইলসন (E. O. Wilson) এবং ডেভিড স্লোয়ান উইলসন (D. S. Wilson) প্রমাণ করেন যে, ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে লড়াইয়ে স্বার্থপর ব্যক্তি জয়ী হলেও, দলগত লড়াইয়ে পরোপকারী ও সুসংগঠিত দলই সবসময় স্বার্থপরদের দলকে পরাজিত করে

যে গোত্র বা মানবদল নিজেদের মধ্যে পরস্পরকে সাহায্য করত, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তারাই টিকে গেছে। [৪]

ঙ. একটি বহুমাত্রিক সমন্বয়: 

জিন-কেন্দ্রিক বনাম দলগত নির্বাচনের দ্বন্দ্ব ও সমাধান
তবে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এ নিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। রিচার্ড ডকিন্সের ‘স্বার্থপর জিন’ তত্ত্ব, যা নির্বাচনের একক হিসেবে ‘জিন’-কে চিহ্নিত করে, আপাতদৃষ্টিতে স্বার্থপর আচরণের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি দেয়। অন্যদিকে, ই. ও. উইলসন-সহ একদল বিজ্ঞানী জোরালোভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, বিবর্তনে দলগত নির্বাচনই (Group Selection) মূল শক্তি, যা পরোপকার ও সহযোগিতার মতো গুণাবলীকে টিকিয়ে রেখেছে। এই আপাত বিরোধের আধুনিক সমাধান হলো ‘বহুস্তরীয় নির্বাচন’ (Multi-level Selection) তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা, যা স্বীকার করে যে প্রাকৃতিক নির্বাচন একইসঙ্গে জিন, কোষ, ব্যক্তিগোষ্ঠী—এই একাধিক স্তরে কাজ করে। জিন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এমন কৌশল তৈরি করে, যা কখনো ব্যক্তির স্বার্থপরতায়, কখনো বা সমগ্র দলের পরোপকারী সহযোগিতার মাধ্যমেই সফল হয়। অর্থাৎ, আপাত স্বার্থপর জিনের কৌশলই শেষ পর্যন্ত নিঃস্বার্থ পরোপকারের জন্ম দিতে পারে, এবং এই জটিল পারস্পরিক ক্রিয়াই মানবসমাজের মতো জটিল সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তুলেছে।

৪. অর্থনীতি ও সমাজ পরিচালনায় অ্যাডাম স্মিথের ‘আত্মস্বার্থ’ তত্ত্ব

আধুনিক অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith) সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের আত্মস্বার্থ (Self-interest)-কে প্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেবল অন্ধ স্বার্থপরতা ছিল না, বরং তা ছিল নৈতিকতার সীমানায় আবদ্ধ এক সামাজিক ভারসাম্য।

ক. ‘অদৃশ্য হাত’ (The Invisible Hand) এবং বাজার অর্থনীতি

১৭৭৬ সালে প্রকাশিত স্মিথের বিখ্যাত গ্রন্থ The Wealth of Nations-এ তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনার জন্য মানুষকে জোর করে পরোপকারী বানানোর প্রয়োজন নেই। মানুষ যখন নিজের লাভের চিন্তা করে কাজ করে, তখন অজান্তেই তা পুরো সমাজের কল্যাণ বয়ে আনে।

স্মিথের সেই বিখ্যাত উক্তি:

আমরা যে প্রতিদিন রাতে খাবার টেবিলে মাংস, মদ বা রুটি পাই—তা কসাই, মদ প্রস্তুতকারক বা রুটি বিক্রেতার দয়া বা পরোপকারের গুণে নয়; বরং তাদের নিজেদের লাভ বা আত্মস্বার্থের চিন্তার ফলেই পাই।
একজন ব্যবসায়ী যখন নিজের লাভ বাড়াতে চায়, তখন সে ভালো পণ্য তৈরি করতে বাধ্য হয় এবং অন্যদের কর্মসংস্থান তৈরি করে। এই ব্যক্তিগত লাভের আকাঙ্ক্ষাই একটি 'অদৃশ্য হাত' (Invisible Hand) হিসেবে কাজ করে এবং সামগ্রিক সমাজকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়। [৫]

খ. ‘আত্মস্বার্থ’ (Self-interest) এবং 'স্বার্থপরতা' (Greed)-এর পার্থক্য

অ্যাডাম স্মিথ আত্মস্বার্থ এবং উগ্র অনৈতিক স্বার্থপরতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছেন।

আত্মস্বার্থ (Self-interest): নিজের দায়িত্ব নেওয়া, নিজের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য চাওয়া এবং আইন মেনে নিজের জীবনযাত্রার উন্নতি করা। এটি সমাজের জন্য ইতিবাচক।
অনিয়ন্ত্রিত লোভ বা উগ্র স্বার্থপরতা (Unbridled Greed): অন্যের ক্ষতি করে বা প্রতারণা করে লাভবান হওয়া। স্মিথ এই ধরনের আচরণকে কঠোরভাবে ধিক্কার জানিয়েছেন।

গ. সহমর্মিতা ও নৈতিক ভিত্তি (Sympathy and Moral Sentiments)

অনেক সময় মনে করা হয় স্মিথ কেবলই বাজার এবং আত্মস্বার্থের কথা বলেছেন, কিন্তু তার আগেই ১৭৫৯ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বই The Theory of Moral Sentiments-এ তিনি মানুষের নৈতিক আচরণের ভিত্তি হিসেবে সহমর্মিতা (Sympathy / Empathy)-কে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

স্মিথ লিখেছেন:
মানুষ যত স্বার্থপরই মনে হোক না কেন, তার স্বভাবের ভেতরে এমন কিছু নীতি প্রাকৃতিকভাবেই বিদ্যমান, যা তাকে অন্যদের ভাগ্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং অন্যদের সুখ-সমৃদ্ধি দেখতে পছন্দ করায়, যদিও এতে তার নিজের কোনো আর্থিক লাভ থাকে না।
স্মিথের মূল দর্শন ছিল—একটি সুস্থ সমাজে বাজার চলবে আত্মস্বার্থের নিয়মে, কিন্তু সমাজ ও রাজ্য টিকে থাকবে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং সহমর্মিতার ওপর। [৬]

📘 বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান (পরোপকার) ও অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতি (আত্মস্বার্থ) তুলনা:

বিষয় বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান (পরোপকার) অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতি (আত্মস্বার্থ)
মূল চালিকাশক্তি জিন রক্ষা, পারস্পরিক লাভ ও দলগত টিকে থাকা। ব্যক্তিগত উন্নয়ন, স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক লাভ।
যেভাবে মানবসভ্যতাকে প্রভাবিত করে সামাজিক বন্ধন, পরিবার গঠন, আইন ও বিচারব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বাজার ব্যবস্থা ও সম্পদ সৃষ্টি করে
প্রধান সীমাবদ্ধতা কেবল স্বজন বা নিজের দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব তৈরি হতে পারে। নিয়ন্ত্রণহীন হলে বৈষম্য, শোষণে রূপ নিতে পারে।

বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান (পরোপকার) ও অ্যাডাম স্মিথের অর্থনীতি (আত্মস্বার্থ)।

উপসংহার: 

সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে পরোপকার ও স্বার্থপরতা পরস্পরবিরোধী মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তারা তা নয়, বরং মানব প্রকৃতির এই দুই পরিপূরক দিকের ভারসাম্যের মধ্যেই রয়েছে মানব সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি। বিবর্তনের ইতিহাস যেমন বলে, জিনের স্বার্থপরতাই পরোপকারের জন্ম দিয়েছে; তেমনি অর্থনীতি আমাদের শেখায়, ব্যক্তিগত আত্মস্বার্থ নৈতিকতার ছোঁয়া পেলেই সভ্যতার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল নিশ্চিত হয়। প্রকৃত পক্ষে এই দুই শক্তির গতিশীল ভারসাম্য রক্ষা যেমন মানব সভ্যতার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তেমনি সবচেয়ে বড় অর্জনও।

তথ্যসূত্র :

  1. Hamilton, W. D. (1964). The Genetical Evolution of Social Behaviour. Journal of Theoretical Biology, 7(1), 1-16.
  2. Trivers, R. L. (1971). The Evolution of Reciprocal Altruism. The Quarterly Review of Biology, 46(1), 35-57.
  3. Dawkins, R. (1976). The Selfish Gene. Oxford University Press.
  4. Wilson, D. S., & Wilson, E. O. (2007). Rethinking the Theoretical Foundation of Sociobiology. The Quarterly Review of Biology, 82(4), 327-348.
  5. Smith, A. (1776). An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations. W. Strahan and T. Cadell, London.
  6. Smith, A. (1759). The Theory of Moral Sentiments. A. Kincaid and J. Bell, Edinburgh.

মন্তব্যসমূহ

📂 আলী হোসেনের জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলি

হিন্দু কারা? তারা কীভাবে হিন্দু হল?

হিন্দু কারা? কীভাবে তারা হিন্দু হল? যদি কেউ প্রশ্ন করেন, অমিত শাহ হিন্দু হলেন কবে থেকে? অবাক হবেন তাই তো? কিন্তু আমি হবো না। কারণ, তাঁর পদবী বলে দিচ্ছে উনি এদেশীয়ই নন, ইরানি বংশোদ্ভুত। কারণ, ইতিহাস বলছে পারস্যের রাজারা ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এবং ‘শাহ’ শব্দটি পার্শি বা ফার্সি। লালকৃষ্ণ আদবানির নামও শুনেছেন আপনি। মজার কথা হল আদবানি শব্দটিও এদেশীয় নয়। আরবি শব্দ ‘আদবান’ থেকে উদ্ভূত। সুতরাং তাঁর পদবীও বলছে, তিনিও এদেশীয় নন। ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চবর্ণের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মানুষদের, উৎসভূমি হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। তারও আগে ছিল ইউরোপের ককেশাস অঞ্চলে। আসলে এরা (উচ্চবর্ণের মানুষ) কেউই এদেশীয় নয়। তারা নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয়ে তারা গর্ববোধ করতেন। সিন্ধু সভ্যতা পরবর্তীকালে তারা পারস্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ ধরে এদেশে অভিবাসিত হয়েছেন। আর মধ্যযুগে এসে এদেরই উত্তরসূরী ইরানিরা (অমিত শাহের পূর্বপুরুষ) অর্থাৎ পারস্যের কিছু পর্যটক-ঐতিহাসিক, এদেশের আদিম অধিবাসীদের ’হিন্দু’ বলে অভিহিত করেছেন তাদের বিভিন্ন ভ্রমণ বৃত্তান্তে। ...

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন আলী হোসেন  যদি প্রশ্ন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী? মনে হয় অনেকেই ঘাবড়ে যাবেন। কেউ বলবেন, তাঁর বাবা যখন ব্রাহ্ম ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্ম হবেন। যারা লেখাপড়া জানেন না, তারা বলবেন, কেন! উনি তো হিন্দু ছিলেন। আবার কেউ কেউ তথ্য সহযোগে এও বলার চেষ্টা করবেন যে, উনি নাস্তিক ছিলেন। না হলে কেউ বলতে পারেন, ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো?¹ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ভাবনার বিবর্তন  তাহলে সঠিক উত্তরটা কী? আসলে এর কোনোটাই সঠিক উত্তর নয়। চিন্তাশীল মানুষ-মাত্রই সারা জীবন ধরে ভাবতে থাকেন। ভাবতে ভাবতে তাঁর উপলব্ধি এগোতে থাকে ক্রমশঃ প্রগতির পথে। এই সময়কালে জগৎ ও জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একে একে গড়ে তোলেন জীবনদর্শনের নিত্যনতুন পর্ব। তাই এ ধরনের চিন্তাশীল মানুষ আজীবন এক এবং অখণ্ড জীবনদর্শনের বার্তা বহন করেন না। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় তাঁর পথচলার গতিমুখ, গড়ে ওঠে উন্নততর জীবন দর্শন। মানুষ রবীন্দ্রনাথও তাই পাল্টে ফেলেছেন তাঁর জীবন ও ধর্মদর্শন; সময়ের এগিয়ে যাওয়াকে অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথ ও  হিন্দু জাতীয়তাবাদ ১৮৬১ সালের ৭ই মে সোমবার রাত্রি ২টা ৩৮ ...

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি - লিখছেন আলী হোসেন  কপালের লেখন খণ্ডায় কার সাধ্য? জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কিংবা লেখাপড়া জানা-নাজানা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কথাটা মেনে নেয়। জীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাসে কপালের লেখনকে জায়গা করে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং বলা ভালো এব্যাপারে তারা অতিমাত্রায় উদার। মানুষের মনস্তত্বের এ-এক জটিল স্তর বিন্যাস। একই মানুষ বিভিন্ন সময়ে একই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণে ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে। এ রকমই একটি দৃষ্টিকোণ হলো কপাল বা ভাগ্যের ভূমিকাকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে ভাবা। কখনও সে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, আবার কখনও নিজেই ভাগ্যের কাছে নির্দিধায় আত্ম সমর্পন করে। নিজের ব্যার্থতার পিছনে ভাগ্যের অদৃশ্য হাতের কারসাজির কল্পনা করে নিজের ব্যার্থতাকে ঢাকা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। মজার কথা, এক্ষেত্রে মুসলিম মানসের মনস্তত্ত্ব কখনও চেতনমনে আবার কখনও অবচেতন মনে উপরওয়ালাকে (আল্লাহকে) কাঠ গড়ায় তোলে বিনা দ্বিধায়। নির্দিধায় বলে দেয়, উপরওয়ালা রাজি না থাকলে কিছুই করার থাকেনা। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সবই তাঁর (আল...

সীমান্ত আখ্যান, বাঙালির আত্মানুসন্ধানের ডিজিটাল আখ্যান

সময়ের সঙ্গে সমস্যার চরিত্র বদলায়। কিন্তু মুলটা বদলায় না। যদি সে সমস্যা ইচ্ছা করে তৈরি হয়ে থাকে বিশেষ সুবিধা ভোগেই লোভে, তবে তো অন্য কথা চলেই না। স্বনামধন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারের ডকুমেন্টারি ফিল্প 'সীমান্ত আখ্যান' দেখার পর এই উপলব্ধি মাথা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখলাম, দেশ ভাগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যার অবসান হয়নি। শুধু সমস্যার চরিত্রটা পাল্টেছে। এই যে সমস্যা রয়ে গেল, কোন গেল? তার উত্তর ও পাওয়া গেল 'সীমান্ত আখ্যান' এ। আসলে দেশ ভাগ তো দেশের জনগণ চাননি, চেয়েছেন দেশের নেতারা। চেয়েছেন তাঁদের ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত সুবিধাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার নেশায়। আর এই নেশার রসদ যোগান দিতে পারার নিশ্চয়তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে থাকার ওপর। তাই রাজনীতিকরা এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য জনগণকে 'ডিভাইড এন্ড রুল' পলিছি দ্বারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন। এ সমস্যা নতুন না, ব্রিটিশ সরকার এর বীজ রোপণ করে গেছেন, এখন কেউ তার সুফল ভোগ করছে (রাজনীতিকরা) আর কেউ কুফল (জনগন)। 'সীমান্ত আখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দে...

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের ভাগ্যলিপিতে লেখা হয়ে গেছে এই বিখ্যাত প্রবাদটির বিস্তারিত সারাৎসার। একদিকে পাকিস্তান আর অন্যদিকে ভারত – এই দুই প্রতিবেশি দেশের ভুরাজনৈতিক স্বার্থের যাঁতাকলে পড়ে তাদের এই হাল। কিন্তু কেন এমন হল? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না এমন মানুষ ভুভারতে হয়তো বা নেই। কিন্তু সেই জানার মধ্যে রয়েছে বিরাট ধরণের ফাঁক। সেই ফাঁক গলেই ঢুকেছে কাশ্মির ফাইলসের মত বিজেপির রাজনৈতিক ন্যারেটিভ যা তারা বহুকাল ধরে করে চলেছে অন্য আঙ্গিকে। এবার নতুন মাধ্যমে এবং নবরূপে তার আগমন ঘটেছে, যায় নাম সিনেমা বা সেলুলয়েড প্রদর্শনী। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সৌজন্যে অনেক আগেই সফলভাবে তারা এই ন্যারেটিভ দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করে চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। টেলিভিশন সম্প্রচারে কর্পোরেট পুজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যার সূচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রশক্তিকে কুক্ষিগত করতে না পারলে দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব নয়, একথা সাধারণ নিরক্ষর নাগরিক এবং ত...

মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস কী শুধুই ধর্মীয় সংঘাতের ইতিহাস? জেমিনাই এআই-এর সাথে একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক বিতর্ক

মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস কী শুধুই ধর্মীয় সংঘাতের ইতিহাস? জেমিনাই এআই-এর সাথে একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক বিতর্ক ও প্রকৃত সত্যের অনুসন্ধান ভূমিকা : সম্প্রতি আমি ( আলী হোসেন ) গুগলের জেমিনাই এআই (Gemini AI)-এর সাথে ইতিহাস রচনার আধুনিক পদ্ধতি এবং মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মূল্যায়ন নিয়ে একটি দীর্ঘ ও বিতর্কিত আলোচনায় অংশ  নিয়েছিলাম। আলোচনার এক পর্যায়ে এআই-এর প্রথমদিকের কিছু প্রচলিত ও অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যাকে যখন যুক্তি এবং আধুনিক ও সুসংবদ্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি কাঠামোর সামনে দাঁড় করালাম , তখন কীভাবে একটি বড় ‘ব্লাইন্ড স্পট’ বা অন্ধবিন্দু পেরিয়ে আসল সত্যটি বেরিয়ে এলো —তার পুরো বিবরণ পাঠকদের জন্য নিচে হুবহু (সংলাপ আকারে) তুলে ধরা হলো। ইতিহাসকে চেনার জন্য এই আলোচনাটি প্রতিটি ইতিহাসপ্রেমীর মনে নতুন খোরাক জোগাবে। মূল সংলাপ: পাঠক (আলী হোসেন) বনাম জেমিনাই এআই Medieval Indian History - Complete 14 Slides Beyond Religious Conflict ...

শিক্ষা কী, কেন প্রয়োজন এবং কীভাবে অর্জন করা যায়?

শিক্ষা কী, কেন এবং কীভাবে অর্জন করতে হয়? সূচিপত্র : What is education, why it is needed and how to achieve it শিক্ষা কী শিক্ষা হল এক ধরনের অর্জন, যা নিজের ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে নিজে নিজেই নিজের মধ্যে জমা করতে হয়। প্রকৃতি থেকেই সেই অর্জন আমাদের চেতনায় আসে। সেই চেতনাই আমাদের জানিয়ে দেয়, জগৎ ও জীবন পরিচালিত হচ্ছে প্রকৃতির কিছু অলংঘনীয় নিয়ম-নীতি দ্বারা। গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ শক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজে লাগালেই এই নিয়মনীতিগুলো আমাদের আয়ত্বে আসে। এই নিয়ম-নীতিগুলো জানা, বোঝা এবং সেই জানা-বোঝার ওপর ভিত্তি করেই জগৎ ও জীবনকে সর্বোত্তম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার পথ খুঁজে বের করার শক্তি অর্জন করা যায়। এই শক্তিই হল শিক্ষা। এক কথায় : শিক্ষা হল একধরনের সামর্থ বা শক্তি যা জগত, জীবন ও রাষ্ট্র-পরিচালনার নিয়মগুলো জানা, বোঝা এবং তাকে সফলভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করা যায় এবং তাকে প্রয়োগ করার মাধ্যমে মানুষ তার জীবনকে সুন্দর ও সফল করে তুলতে পারে। মনে রাখতে হবে, এই শিক্ষা কখনও কারও মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন হল, শিক্ষা অর্জনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিটা আসলে কী। স...

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন আলী হোসেন বিচার একটি যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। বিচারক কখনই সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না, যদি না এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা ও তার কর্মকর্তারা উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং বিচারককে তা সরবরাহ করতে পারেন। আর বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি শক্তির আধার; তা যার হাতে থাকে, তিনিই বিচারক। এই শক্তি ন্যায়বিচার তখনই দিতে পারে, যখন বিচারক নিরপেক্ষ থাকার সৎ সাহস দেখান এবং সাংবিধানিক আইন এবং তার প্রয়োগ বিষয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তবে তাঁর সফলতা নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনজীবীরা কতটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই তথ্য বিচারকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তার উপর। তাই একজন বিচারক বা বিচার ব্যবস্থা যা বিধান দেয়, তা সব সময় একশ শতাংশ সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হবে - এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো একটি পক্ষ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে ন্যায় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, ...

জল, না পানি : জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয়

জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয় আলী হোসেন  সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে চিত্র শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য পানি শব্দকে বাংলা নয় বলে দাবি করেছেন। বলেছেন, "আমরা কোনোদিন কখনও বাংলা ভাষায় পানি (শব্দটা) ব্যবহার করি না"। শুধু তা-ই নয়, পানি শব্দের ব্যবহারের মধ্যে তিনি 'সাম্প্রদায়িকতার ছাপ'ও দেখতে পেয়েছেন। প্রশ্ন হল - এক, এই ভাবনা কতটা বাংলা ভাষার পক্ষে স্বাস্থ্যকর এবং কতটা 'বাংলা ভাষার ইতিহাস' সম্মত? দুই, জল বা পানি নিয়ে যারা জলঘোলা করছেন তারা কি বাংলাকে ভালোবেসে করছেন? মনে হয় না। কারণ, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা কেউ নিজের সন্তানকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াননি বা পড়ান না। ব্যবহারিক জীবনেও তারা বাংলার ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে বা গান শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, বলা ভালো গর্ববোধ করেন। প্রসংগত মনে রাখা দরকার, বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যারা ভর্তি হয়, তারা অধিকাংশই গরীব ঘরের সন্তান। বলা ভালো, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তারাই বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ, সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর পাশাপাশি, বা...

নিম্নবর্গের মানুষ মার খাচ্ছে কেন

নিম্নবর্গের মানুষ কীভাবে পিছিয়ে পড়েছেন? সমাধান কীভাবে? এদেশের নিম্নবর্গের মানুষ নিজেদের বাঁচাতে যুগ যুগ ধরে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। কখনও বৌদ্ধ (প্রাচীন যুগ), কখনও মুসলমান (মধুযুগ), কিম্বা কখনো খ্রিস্টান (আধুনিক যুগ) হয়েছে। কিন্তু কখনই নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে পাল্টানোর কথা ভাবেনি। পরিবর্তন হচ্ছে অলংঘনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম। যারা এই নিয়ম মেনে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, তারাই লাভবান হয়, টিকে থাকে। “পাল্টে গেলেই জীবন বাড়ে না পাল্টালে নয়, জীবন মানেই এগিয়ে যাওয়া নইলে মৃত্যু হয়” জীবনের এই চরম সত্য তারা অধিকাংশই উপলব্ধি করতে পারেনি। পৃথিবীর যেকোন উন্নত জাতির দিকে তাকান, তারা দ্রুততার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে মেনে নিজেদেরকে পুনর্গঠন করে নিয়েছে। যারা পারেনি বা নেয়নি তারাই মার খাচ্ছে, অতীতেও খেয়েছে। বুদ্ধিমান জাতি নিজের দুর্বলতাকে মেনে নেয় এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময়ের সঙ্গে তাল রেখে নিজেদের চিন্তা এবং চেতনায় পরিবর্তন আনে। খ্রিষ্টান, ইহুদি-সহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জাতি - যারাই এই পরিবর্তন মেনে নিয়েছে তারাই আরও উন্নত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মহানবীর (সঃ) গৌরবময় উত্থান (যা এক ধরণ...