আমেরিকায় কি গরীব মানুষ আছে? তাঁরা কীভাবে বাঁচেন?
আমেরিকায় বেকার এবং অত্যন্ত দরিদ্র মানুষের খাদ্যের সংস্থান মূলত সরকারি সহায়তা, বেসরকারি দাতব্য সংস্থা এবং স্থানীয় কমিউনিটির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে অনাহার রোধে বেশ কিছু শক্তিশালী ব্যবস্থা চালু আছে :
১. সরকারি সহায়তা (SNAP বা Food Stamps)
এটি আমেরিকার সবচেয়ে বড় খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। যারা বেকার বা যাদের আয় নির্দিষ্ট সীমার নিচে, তারা Supplemental Nutrition Assistance Program (SNAP)-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে একটি ইলেকট্রনিক কার্ডের (EBT Card) মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পান। এই টাকা দিয়ে শুধুমাত্র অনুমোদিত গ্রোসারি বা মুদির দোকান থেকে চাল, ডাল, দুধ, ফল বা সবজির মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কেনা যায়।২. ফুড প্যান্ট্রি এবং ফুড ব্যাংক (Food Pantries & Food Banks)
সরকারি সহায়তার বাইরেও অনেক মানুষ খাদ্যের অভাব বোধ করলে স্থানীয় Food Pantry-তে যান। এগুলো সাধারণত বিভিন্ন *এনজিও* বা *ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান* (যেমন চার্চ) দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে মানুষ বিনামূল্যে প্যাকেটজাত খাবার, কৌটোজাত ফুড এবং মাঝেমধ্যে তাজা শাকসবজি সংগ্রহ করতে পারেন।৩. স্যুপ কিচেন (Soup Kitchens) :
যাদের রান্নার কোনো জায়গা নেই (যেমন গৃহহীন মানুষ), তারা Soup Kitchen বা কমিউনিটি কিচেন থেকে প্রতিদিন তৈরি করা গরম খাবার খেতে পারেন। অনেক বড় শহরে দাতব্য সংস্থাগুলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে এই খাবারের আয়োজন করে।৪. শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি :
দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিশেষ কিছু ব্যবস্থা রয়েছে।ক) WIC Program:
এটি গর্ভবতী মহিলা এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টিকর খাবার (যেমন দুধ, ডিম, সিরিয়াল) নিশ্চিত করে।
School Meals:
সরকারি স্কুলগুলোতে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য বিনামূল্যে সকালের নাস্তা এবং দুপুরের খাবারের (Free Lunch) ব্যবস্থা থাকে।
৫. রিলিজিয়াস ও কমিউনিটি সাহায্য :
বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (চার্চ, মসজিদ বা সিনাগগ) এবং স্থানীয় পাড়া-প্রতিবেশীরাও অনেক সময় বিনামূল্যে খাবার বিতরণ বা "কমিউনিটি ফ্রিজ" (Community Fridge)-এর ব্যবস্থা রাখেন, যেখান থেকে যে কেউ প্রয়োজনমতো খাবার নিতে পারেন।আমেরিকার গরীব মানুষের সংখ্যা :
ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর (U.S. Census Bureau) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আমেরিকার জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি ২৪ লক্ষ (৩৪২.৪ মিলিয়ন)।বিশ্বে অবস্থান
জনসংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে, আমেরিকা এখন বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম দেশ (ভারত ও চীনের পরে)।জনসংখ্যার বৃদ্ধির গতি:
যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি ৯ সেকেন্ডে একটি শিশুর জন্ম হয় এবং প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া, প্রতি ২৮ সেকেন্ডে একজন নতুন অভিবাসী সে দেশে যুক্ত হয়।আমেরিকায় দারিদ্র্যের হার:
ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান (২০২৪-২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী) আমেরিকায় দারিদ্র্যের চিত্রটি প্রধানত দুটি মানদন্ডে পরিমাপ করা হয়:১) অফিসিয়াল পোভার্টি রেট (Official Poverty Rate):
এই হিসেবে দারিদ্র্যের হার ১০.৬%। অর্থাৎ প্রায় ৩৫.৯ মিলিয়ন (৩ কোটি ৫৯ লক্ষ) মানুষ অফিশিয়াল দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।২) সাপ্লিমেন্টাল পোভার্টি মেজার (SPM) :
এটি সরকারি সাহায্য (যেমন ফুড স্ট্যাম্প) এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে তৈরি করা হয়। এই হিসেবে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১২.৯%, যা সংখ্যায় প্রায় ৪৩.৭ মিলিয়ন (৪ কোটি ৩৭ লক্ষ) মানুষ।
১) ২০২৪ সালে:
দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ (২০২৪-২০২৬) মাপকাঠি :
আমেরিকায় একটি পরিবারের সদস্য সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে দারিদ্র্যসীমা (Poverty Threshold) নির্ধারণ করা হয়। যেমন:১) ২০২৪ সালে:
চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য বার্ষিক আয় $৩২,১৩০ (প্রায় ২৭ লক্ষ টাকা) এর নিচে হলে তাদের দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
২) ২০২৬ সালে:
২) ২০২৬ সালে:
মুদ্রাস্ফীতির কারণে এই সীমা বেড়ে চার সদস্যের পরিবারের জন্য প্রায় $৩৩,০০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
আঞ্চলিক পার্থক্য: নিউ মেক্সিকো, মিসিসিপি এবং লুইসিয়ানার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :
শিশু দারিদ্র্য: আমেরিকায় শিশুদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি, যা প্রায় ১৩.৭% (SPM অনুযায়ী)।আঞ্চলিক পার্থক্য: নিউ মেক্সিকো, মিসিসিপি এবং লুইসিয়ানার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি।
গৃহহীনতা: ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় গৃহহীন মানুষের সংখ্যা রেকর্ড গড়ে ৭,৭০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দারিদ্র্যের তুলনা
চীন গত কয়েক দশকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও দ্রুততম দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য অর্জন করেছে এবং চরম দারিদ্র্যের সমস্যার ঐতিহাসিক সমাধান করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, সেখানে দারিদ্র্যের সমস্যা গভীরভাবে প্রোথিত এবং ক্রমাগত আরও খারাপ হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। নিচে দারিদ্র্যসীমার অধীনে থাকা মানুষের সংখ্যা, পরিমাপের মানদণ্ড, আর্থিক অবস্থা এবং নীতিগত কারণগুলোর ভিত্তিতে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : মূল দারিদ্র্যসীমার অধীনে জনসংখ্যা :
প্রায় ৩৬ মিলিয়ন (২০২৪ সালের সরকারি দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী); ৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ প্রতিদিন ৩ ডলারের কমে জীবনযাপন করে (বিশ্ব ব্যাংকের মানদণ্ড)চিন: মূল দারিদ্র্যসীমার অধীনে জনসংখ্যা :
প্রতিদিন ৩ ডলারের কমে জীবনযাপনের চরম দারিদ্র্য দূর করা হয়েছে (বিশ্ব ব্যাংকের মানদণ্ড)।
২) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : উচ্চ মানদণ্ডে দারিদ্র্য।
প্রায় ২৩.৫% মানুষ "খাদ্য মরুভূমি"-তে বাস করেন; ১৩.৭% পরিবার "খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার" সম্মুখীনচিন : উচ্চ মানদণ্ডে দারিদ্র্য।
প্রায় ২৪৩ মিলিয়ন মানুষের দৈনিক ভোগ expenditure ৬.৮৫ ডলারের নিচে (বিশ্ব ব্যাংকের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মানদণ্ড)
৩) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : আয় বণ্টন কাঠামো।
সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের মোট দেশজ আয়ের মাত্র ১.৮% আছে (বলিভিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশের সমতুল্য)চিন : আয় বণ্টন কাঠামো।
সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের মোট দেশজ আয়ের ৩.১% আছে
৪) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : সর্বশেষ প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য ।
কে-আকৃতির অর্থনীতি স্পষ্ট: ২৪% পরিবার "মাস শেষে টাকা শেষ" অবস্থায় আছে; নিম্ন আয়ের পরিবারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি; দরিদ্র জনসংখ্যা ৩৫ বছর আগের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি।চিন : সর্বশেষ প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থরতার চাপ; অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমতে পারে।
৫) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : সরকারি নীতির দিকনির্দেশনা।
বিশাল কল্যাণ ব্যবস্থা (৮০টির বেশি প্রকল্প), কিন্তু নীতির বিতাস "কাজের প্রণোদনা" নিয়ে; বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে কিছু নীতি (যেমন শুল্ক) দারিদ্র্য আরও বাড়াতে পারেচিন : সরকারি নীতির দিকনির্দেশনা।
দারিদ্র্য বিমোচনকে মূল নীতি লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও সামষ্টিক নীতির মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান রক্ষা; ভোগ বাড়ানোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা অব্যাহত
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন