আমেরিকায় কি গরীব মানুষ আছে? তাঁরা কীভাবে বাঁচেন?
আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। তাই সাধারণ মানুষের ধারণা, আমেরিকায় কোন গরিব মানুষের বসবাস নেই। কিন্তু সত্যি কি তাই? তথ্য কী বলছে, আসুন জেনে নেওয়া যাক।
তথ্য বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সত্যিই গরিব মানুষের অস্তিত্ব আছে। শুধু যে আছে তাই নয়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন নীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
আসলে শক্তিশালী অর্থনীতি এবং বিলাসবহুল জীবনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও অর্থনীতিতে রয়েছে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক।
🇺🇸 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্যের চিত্র
· প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা ও সংখ্যা:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য সরকারি সংজ্ঞা রয়েছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৬ মিলিয়ন (৩.৬ কোটি) আমেরিকান সরকারি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিল। এই সংখ্যাটি সমগ্র মালয়েশিয়া বা পেরুর জনসংখ্যার প্রায় সমান।
· প্রচলিত ভুল ধারণা:
অনেকের ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশে দারিদ্র্য বলতে শুধু গৃহহীন বা বেকার লোকেদের বোঝায়। কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র অনেক জটিল। অনেক নিম্নআয়ের পরিবারই ‘মাস শেষে টাকা শেষ’ (paycheck to paycheck) অবস্থায় থাকে । তার মানে, একটি ছোটখাটো আর্থিক বিপর্যয়, যেমন হঠাৎ গাড়ি মেরামত বা অসুস্থতা, তাদের দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গরিব মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয় এবং বিভিন্ন নীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে এই সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সতর্ক করে দিয়েছে যে, বর্তমান নীতির ফলে আগামী দিনে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও কমতে পারে ।
চিন : প্রায় ২৪৩ মিলিয়ন মানুষের দৈনিক ব্যায় (expenditure) ৬.৮৫ ডলারের নিচে (বিশ্ব ব্যাংকের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মানদণ্ড)
চিন : সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের মোট দেশজ আয়ের ৩.১% আছে।
চিন : মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থরতার চাপে, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে দারিদ্র্য দূরীকরণের গতি কমতে পারে।
চিন : দারিদ্র্য দূরীকরণকে মূল নীতি ও লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও সামষ্টিক নীতির মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান রক্ষা; ব্যায় বাড়ানোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
🆕 কোন কারণ দারিদ্র্যকে আরও বাড়াচ্ছে?
সম্প্রতি নেওয়া কিছু নীতি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর উপর চাপ আরও বাড়িয়ে তুলছে।১) নীতির প্রভাব:
সম্প্রতি Medicaid (স্বাস্থ্যসেবা) এবং SNAP (খাদ্য সহায়তা) এর মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে, যা লক্ষ লক্ষ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দুর্ভোগ বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, একা স্বাস্থ্যসেবা নীতির পরিবর্তনের ফলে প্রায় ৫০ লক্ষ (৫ মিলিয়ন) মানুষ স্বাস্থ্যবিমা হারাতে পারে।
২) শুল্কের বোঝা:
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশী পণ্যের উপর যে উচ্চ হারে শুল্ক বসানো হয়েছে, তা মূলত নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। কারণ, তারা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ ভোগ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় করে।
· ইয়েল ইউনিভার্সিটির ‘বাজেট ল্যাব’-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই শুল্কনীতির ফলে ২০২৬ সালের মধ্যে আরও ৮,৭৫,০০০ (৮.৭৫ লক্ষ) আমেরিকান দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে, যার মধ্যে ৩,৭৫,০০০ (৩.৭৫ লক্ষ) শিশু রয়েছে ।
· বিশেষজ্ঞরা এই নতুন শুল্ক নীতিকে ‘আমেরিকান পরিবারের উপর কর’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
· বিশেষজ্ঞরা এই নতুন শুল্ক নীতিকে ‘আমেরিকান পরিবারের উপর কর’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
৩) ‘কে-আকৃতির অর্থনীতি':
আমেরিকার অর্থনীতি এখন ‘কে-আকৃতির’ পথে হাঁটছে, যার অর্থ হল ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, আর গরিবরা আরও পিছিয়ে পড়ছে। শেয়ারবাজার যখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে এবং ধনীদের সম্পদ বাড়ছে, তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং মৌলিক চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
🔍 তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি (চিন)
চিনের সাথে তুলনা করলে মার্কিন দারিদ্র্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। চিন যেখানে চরম দারিদ্র্য (প্রতিদিন ৩ ডলারের কমে জীবনযাপন) দূর করার ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে ভুগছে। চিনে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ের হার (৩.১%) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (১.৮%) তুলনায় বেশি, যা আয় বণ্টনের কিছুটা সমতা নির্দেশ করে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গরিব মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয় এবং বিভিন্ন নীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে এই সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সতর্ক করে দিয়েছে যে, বর্তমান নীতির ফলে আগামী দিনে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও কমতে পারে ।
গরিব মানুষদের জন্য কী ধরনের সহায়তা কর্মসূচি
আমেরিকায় বেকার এবং অত্যন্ত দরিদ্র মানুষের খাদ্যের সংস্থান মূলত সরকারি সহায়তা, বেসরকারি দাতব্য সংস্থা এবং স্থানীয় কমিউনিটির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে অনাহার রোধে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা চালু আছে :১. সরকারি সহায়তা (SNAP বা Food Stamps)
এটি আমেরিকার সবচেয়ে বড় খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। যারা বেকার বা যাদের আয় নির্দিষ্ট সীমার নিচে, তারা Supplemental Nutrition Assistance Program (SNAP)-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে একটি ইলেকট্রনিক কার্ডের (EBT Card) মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পান। এই টাকা দিয়ে শুধুমাত্র অনুমোদিত গ্রোসারি বা মুদির দোকান থেকে চাল, ডাল, দুধ, ফল বা সবজির মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কেনা যায়।২. ফুড প্যান্ট্রি এবং ফুড ব্যাংক (Food Pantries & Food Banks)
সরকারি সহায়তার বাইরেও অনেক মানুষ খাদ্যের অভাব বোধ করলে স্থানীয় Food Pantry-তে যান। এগুলো সাধারণত বিভিন্ন এনজিও বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (যেমন চার্চ) দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে মানুষ বিনামূল্যে প্যাকেটজাত খাবার, কৌটোজাত ফুড এবং মাঝেমধ্যে তাজা শাকসবজি সংগ্রহ করতে পারেন।৩. স্যুপ কিচেন (Soup Kitchens) :
যাদের রান্নার কোনো জায়গা নেই (যেমন গৃহহীন মানুষ), তারা Soup Kitchen বা কমিউনিটি কিচেন থেকে প্রতিদিন তৈরি করা গরম খাবার খেতে পারেন। অনেক বড় শহরে দাতব্য সংস্থাগুলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে এই খাবারের আয়োজন করে।৪. শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি :
দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিশেষ কিছু ব্যবস্থা রয়েছে।ক) WIC Program:
এটি গর্ভবতী মহিলা এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টিকর খাবার (যেমন দুধ, ডিম, সিরিয়াল) নিশ্চিত করে।
School Meals:
সরকারি স্কুলগুলোতে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য বিনামূল্যে সকালের নাস্তা এবং দুপুরের খাবারের (Free Lunch) ব্যবস্থা থাকে।
৫. রিলিজিয়াস ও কমিউনিটি সাহায্য :
বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (চার্চ, মসজিদ বা সিনাগগ) এবং স্থানীয় পাড়া-প্রতিবেশীরাও অনেক সময় বিনামূল্যে খাবার বিতরণ বা ‘কমিউনিটি ফ্রিজ’ (Community Fridge)-এর ব্যবস্থা রাখেন, যেখান থেকে যে কেউ প্রয়োজনমতো খাবার নিতে পারেন।আমেরিকার গরীব মানুষের সংখ্যা :
ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর (U.S. Census Bureau) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আমেরিকার জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি ২৪ লক্ষ (৩৪২.৪ মিলিয়ন)।বিশ্বে অবস্থান
জনসংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে, আমেরিকা এখন বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম দেশ (ভারত ও চীনের পরে)।জনসংখ্যার বৃদ্ধির গতি:
যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি ৯ সেকেন্ডে একটি শিশুর জন্ম হয় এবং প্রতি ১০ সেকেন্ডে একজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া, প্রতি ২৮ সেকেন্ডে একজন নতুন অভিবাসী সে দেশে যুক্ত হয়।আমেরিকায় দারিদ্র্যের হার:
ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান (২০২৪-২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী) আমেরিকায় দারিদ্র্যের চিত্রটি প্রধানত দুটি মানদন্ডে পরিমাপ করা হয়:১) অফিসিয়াল পোভার্টি রেট (Official Poverty Rate):
এই হিসেবে দারিদ্র্যের হার ১০.৬%। অর্থাৎ প্রায় ৩৫.৯ মিলিয়ন (৩ কোটি ৫৯ লক্ষ) মানুষ অফিশিয়াল দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।২) সাপ্লিমেন্টাল পোভার্টি মেজার (SPM) :
এটি সরকারি সাহায্য (যেমন ফুড স্ট্যাম্প) এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে তৈরি করা হয়। এই হিসেবে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১২.৯%, যা সংখ্যায় প্রায় ৪৩.৭ মিলিয়ন (৪ কোটি ৩৭ লক্ষ) মানুষ।
১) ২০২৪ সালে:
দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ (২০২৪-২০২৬) মাপকাঠি :
আমেরিকায় একটি পরিবারের সদস্য সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে দারিদ্র্যসীমা (Poverty Threshold) নির্ধারণ করা হয়। যেমন:১) ২০২৪ সালে:
চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য বার্ষিক আয় $৩২,১৩০ (প্রায় ২৭ লক্ষ টাকা) এর নিচে হলে তাদের দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
২) ২০২৬ সালে:
২) ২০২৬ সালে:
মুদ্রাস্ফীতির কারণে এই সীমা বেড়ে চার সদস্যের পরিবারের জন্য প্রায় $৩৩,০০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
আঞ্চলিক পার্থক্য: নিউ মেক্সিকো, মিসিসিপি এবং লুইসিয়ানার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :
শিশু দারিদ্র্য: আমেরিকায় শিশুদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি, যা প্রায় ১৩.৭% (SPM অনুযায়ী)।আঞ্চলিক পার্থক্য: নিউ মেক্সিকো, মিসিসিপি এবং লুইসিয়ানার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি।
গৃহহীনতা: ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় গৃহহীন মানুষের সংখ্যা রেকর্ড গড়ে ৭,৭০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দারিদ্র্যের তুলনা
চিন গত কয়েক দশকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও দ্রুততম দারিদ্র্য দূরীকরণে সাফল্য অর্জন করেছে এবং চরম দারিদ্র্যের সমস্যার ঐতিহাসিক সমাধান করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, সেখানে দারিদ্র্যের সমস্যা গভীরভাবে প্রোথিত এবং ক্রমাগত আরও খারাপ হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।নিচে দারিদ্র্যসীমার অধীনে থাকা মানুষের সংখ্যা, পরিমাপের মানদণ্ড, আর্থিক অবস্থা এবং নীতিগত কারণগুলোর ভিত্তিতে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
১) মূল দারিদ্র্যসীমার অধীনে জনসংখ্যা :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : প্রায় ৩৬ মিলিয়ন (২০২৪ সালের সরকারি দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী); ৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ প্রতিদিন ৩ ডলারের কমে জীবনযাপন করে (বিশ্ব ব্যাংকের মানদণ্ড)চিন: মূল দারিদ্র্যসীমার অধীনে জনসংখ্যা :
প্রতিদিন ৩ ডলারের কমে জীবনযাপনের চরম দারিদ্র্য দূর করা হয়েছে (বিশ্ব ব্যাংকের মানদণ্ড)।২) উচ্চ মানদণ্ডে দারিদ্র্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : প্রায় ২৩.৫% মানুষ ‘খাদ্য মরুভূমি’-তে বাস করেন; ১৩.৭% পরিবার ‘খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার’ সম্মুখীন।চিন : প্রায় ২৪৩ মিলিয়ন মানুষের দৈনিক ব্যায় (expenditure) ৬.৮৫ ডলারের নিচে (বিশ্ব ব্যাংকের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মানদণ্ড)
৩) আয় বণ্টন কাঠামো।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের মোট দেশজ আয়ের মাত্র ১.৮% আছে (বলিভিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশের সমতুল্য)।চিন : সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের মোট দেশজ আয়ের ৩.১% আছে।
৪) সর্বশেষ প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : কে-আকৃতির অর্থনীতি স্পষ্ট আকার ধারণ করেছে। ২৪% পরিবার ‘মাস শেষে টাকা শেষ’ অবস্থায় আছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। দরিদ্র জনসংখ্যা ৩৫ বছর আগের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি।চিন : মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থরতার চাপে, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে দারিদ্র্য দূরীকরণের গতি কমতে পারে।
৫) সরকারি নীতির দিকনির্দেশনা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র : বিশাল কল্যাণ ব্যবস্থা (৮০টির বেশি প্রকল্প) চালু রয়েছে, কিন্তু নীতির বিতাস ‘কাজের প্রণোদনা’ নিয়ে; বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে কিছু নীতির (যেমন শুল্ক) দারিদ্র্য আরও বাড়াতে পারে।চিন : দারিদ্র্য দূরীকরণকে মূল নীতি ও লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও সামষ্টিক নীতির মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান রক্ষা; ব্যায় বাড়ানোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
🇺🇸 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ধনী দেশে দারিদ্র্যের অসঙ্গতি
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্যের সমস্যা মূলত আপেক্ষিক দারিদ্র্য এবং মেরুকরণ হিসেবে প্রকাশ পায়।১) দারিদ্র্যের আকার ও মানদণ্ড:
মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ১০.৬% , যা প্রায় ৩৫.৯ মিলিয়ন দরিদ্র মানুষের সমতুল্য। তবে, বিশ্ব ব্যাংকের আরও কঠোর ‘প্রতিদিন ৩ ডলারের কমে জীবনযাপন’ এর চরম দারিদ্র্যের মানদণ্ড ব্যবহার করলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনও ৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছেন, যা ১৯৯০ সালের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি।২) কাঠামোগত বিভাজন:
মার্কিন অর্থনীতিতে একটি স্পষ্ট "কে-আকৃতির" বিভাজন রেখা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাংক অফ আমেরিকার তথ্য বলছে, প্রায় ২৪% মার্কিন পরিবার ‘মাস শেষে টাকা শেষ’ অবস্থায় রয়েছে, যেখানে নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে এই হার ২৯% ।শীর্ষ ১০% ধনী মানুষের আয় বৃদ্ধির হার সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি, যার ফলে সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের আয়ের অংশ মোট দেশজ আয়ের মাত্র ১.৮% , যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের সমতুল্য।
৩) দারিদ্র্যের কারণ ও সরকারের ভূমিকা:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা (৮০টির বেশি প্রকল্প, বার্ষিক ব্যয় ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি) থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্যের সমস্যা জটিল থেকে যাচ্ছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি শুধু বাজার অর্থনীতির ফল নয়, বরং নীতি নির্বাচনেরও ফল। ‘রেগান যুগে’ (রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান) শ্রমিক ইউনিয়ন দুর্বল করা থেকে শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসনের ধনীদের পক্ষে কর ছাড় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াতে পারে এমন শুল্ক নীতি, সবই অসম বণ্টনকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘ইয়েল বাজেট ল্যাবে’র মূল্যায়নে দেখা গেছে, কিছু নীতির সমন্বয় সবচেয়ে দরিদ্র ১০% পরিবারের আয় ৭% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।🇨🇳 চীন: চরম দারিদ্র্য দূর করা থেকে নতুন উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
চিনের দারিদ্র্য দূরীকরণে সাফল্য মূলত জীবনধারণের মানের উন্নতির মাধ্যমে দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে। বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলি হল আপেক্ষিক দারিদ্র্য ও অসম উন্নয়ন-কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সম্পর্কিত সমস্যা।১) ঐতিহাসিক সাফল্য:
বিশ্ব ব্যাংকের চরম দারিদ্র্যের মানদণ্ড (প্রতিদিন ৩ ডলারের কমে জীবনযাপন) অনুযায়ী, চিনে ১৯৯০ সালে ৯৪৩ মিলিয়ন দরিদ্র মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৮৩%) ছিল, যা ২০১৯ সালে শূন্যে নেমে এসেছে। এটি চিনের উন্নয়নের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সাফল্য।২) নতুন পর্যায়ে দারিদ্র্যের মানদণ্ড:
অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে চিনের দারিদ্র্য মোকাবিলার মানদণ্ডও বাড়ছে। বিশ্ব ব্যাংকের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মানদণ্ড (প্রতিদিন ৬.৮৫ ডলারের কমে জীবনযাপন) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চিনে এখনও প্রায় ২৪৩ মিলিয়ন মানুষ এই স্তরে রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার ১৭% । এই অংশের মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেলেও তাদের জীবন এখনও সচ্ছল নয় এবং তারা দুর্বল, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কম।৩) বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলা:
বর্তমানে চীনের অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি চাপ, রিয়েল এস্টেট মন্দাভাব এবং জনসংখ্যায় বার্ধক্যের মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা টেকসই দারিদ্র্য দূরীকরণে ও আয় বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ২০২৬ সালের সরকারি কাজের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, জনগণের আয় বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা, ভোগ (ব্যায়) উদ্দীপিত করা ইত্যাদি বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে জনজীবন রক্ষা এবং বড় আকারে দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়া রোধ করতে হবে।আয় বণ্টন কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চিনের সবচেয়ে দরিদ্র ১০% মানুষের মোট দেশজ আয়ের অংশ ৩.১% , যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি।
উপসংহার
চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্যের সমস্যা বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায় ও মাত্রায় অবস্থান করছে। চিনের মূল কাজ হলো- ১) অর্জিত দারিদ্র্য দূরীকরণের ফল ধরে রাখা,
- ২);অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার প্রেক্ষাপটে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং
- ৩) আঞ্চলিক সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে আপেক্ষিক দারিদ্র্য ও নগর-গ্রামের বৈষম্য ধীরে ধীরে কমানো।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি অত্যন্ত উন্নত অর্থনীতিতে কীভাবে—
- ১) নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমানো যায় এবং
- ২) প্রাতিষ্ঠানিক দারিদ্র্যের গভীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়, সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এইভাবে এই দু'দেশের তুলনামূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্যকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
----------xx-----------
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য একটি জটিল ও ব্যাপক সমস্যা। এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকারি, রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে।
মার্কিন সরকার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের নাগরিকদের জন্য প্রধানত ছয়টি ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়ে থাকে: নগদ অর্থ, খাদ্য, স্বাস্থ্য, আবাসন, শিক্ষা ও ইউটিলিটি বিল। এই কর্মসূচিগুলোর আওতা ও আর্থিক পরিমাণ অনেক বড়।
১) নগদ অর্থ সহায়তা (Cash Assistance) কর্মসূচি :
সরাসরি নগদ টাকা বা ট্যাক্স রিফান্ডের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হয়, যা খরচের স্বাধীনতা দেয় ।
ক) টেম্পোরারি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর নিডি ফ্যামিলিজ (TANF):
এটি সবচেয়ে পরিচিত ‘কল্যাণমূলক’ কর্মসূচি। সন্তান আছে এমন অতি দরিদ্র পরিবারকে অস্থায়ী আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। একটি পরিবার আজীবনে সর্বোচ্চ ৬০ মাস এই সহায়তা নিতে পারে। মাসিক সহায়তার পরিমাণ রাজ্য ভেদে ভিন্ন হয়, যেমন ওকলাহোমায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও দুই সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ২৯২ ডলার, ওয়াশিংটন রাজ্যে ৬৫৪ ডলার পর্যন্ত পাওয়া যায় ।
খ) সাপ্লিমেন্টাল সিকিউরিটি ইনকাম (SSI):
বয়স্ক (৬৫ বছর বা তার বেশি), অন্ধ বা অক্ষম ব্যক্তিরা, যাদের আয় ও সম্পদ খুবই সীমিত, তাদের জন্য এই কর্মসূচি। ২০২৫ সালে একজন যোগ্য ব্যক্তি মাসিক সর্বোচ্চ ৯৬৭ ডলার পর্যন্ত পেতে পারেন ।
গ) আর্নড ইনকাম ট্যাক্স ক্রেডিট (EITC):
এটি ট্যাক্স ফেরতের মাধ্যমে দেওয়া হয়। নিম্ন থেকে মাঝারি আয়ের কর্মজীবী মানুষের জন্য এই সহায়তা। ২০২৪ সালে প্রায় ২৪ মিলিয়ন করদাতা এই সুবিধা পেয়েছেন। ৩১টি রাজ্যে নিজস্ব রাজ্য পর্যায়ের EITC-ও আছে।
ঘ) চাইল্ড ট্যাক্স ক্রেডিট (CTC):
পরিবার প্রতি সন্তানের জন্য ট্যাক্স ছাড়। ২০২৪ সালে প্রায় ১১% করদাতা এর রিফান্ডেবল অংশ পেয়েছেন, যা ফেরত হিসেবে নগদ অর্থ পাওয়া যায়।
২) খাদ্য সহায়তা (Food Assistance) কর্মসূচি :
পুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং খাদ্য ব্যয় কমাতে এসব কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ক) সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (SNAP):
এটি আগে ‘ফুড স্ট্যাম্প’ নামে পরিচিত ছিল। যোগ্য পরিবারগুলি একটি ইলেকট্রনিক কার্ড (EBT) পায়, যা দিয়ে অনুমোদিত দোকান থেকে খাবার কেনা যায়। ২০২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু গড় মাসিক বেনিফিট প্রায় ১৮৭ ডলার।
খ) ন্যাশনাল স্কুল লাঞ্চ প্রোগ্রাম (NSLP):
কম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে বিনামূল্যে বা কম মূল্যে মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে, ৪ সদস্যের একটি পরিবারের বার্ষিক আয় ৪১,৭৯৫ ডলার বা তার কম হলে বিনামূল্যে, এবং ৫৯,৪৭৮ ডলার বা তার কম হলে মূল্যহ্রাসকৃত মূল্যে খাবার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।
গ) উইমেন, ইনফ্যান্ট অ্যান্ড চিলড্রেন (WIC) :
গর্ভবতী মহিলা, প্রথম মা এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার, কাউন্সেলিং এবং স্বাস্থ্যসেবার রেফারেল প্রদান করা হয়।
৩) 🏠 আবাসন, ইউটিলিটি ও অন্যান্য সহায়তা :
মৌলিক চাহিদা পূরণে এবং দারিদ্র্যসীমার বাইরে যেতে আরও কিছু কর্মসূচি রয়েছে।
I) আবাসন সহায়তা:
‘হাউজিং চয়েস ভাউচার’ (সেকশন ৮) কর্মসূচির মাধ্যমে ভাড়া সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া জরুরি অবস্থায় ভাড়া পরিশোধের জন্যও সহায়তা রয়েছে।
II) লো ইনকাম হোম এনার্জি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (LIHEAP):
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল পরিশোধে সহায়তা করা হয়। অনুদানের পরিমাণ সাধারণত ৫০০ থেকে ১৫০০ ডলারের মধ্যে হয়ে থাকে, যা সরাসরি ইউটিলিটি কোম্পানিকে দেওয়া হয়।
III) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য:
ক) পেল গ্র্যান্ট: উচ্চশিক্ষার জন্য অনুদান, যা ফেরত দিতে হয় না। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সর্বোচ্চ ৭,৩৯৫ ডলার পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে।
ক) হেড স্টার্ট: প্রি-স্কুল শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ।
গ) মেডিকেড ও চিলড্রেনস হেলথ ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রাম (CHIP): নিম্নআয়ের মানুষ ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচের স্বাস্থ্যবিমা।
----------xx-----------
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন