হাওয়ার্ড জিন ও তাঁর ইতিহাস দর্শন :
Howard Zinn and his philosophy of history
হাওয়ার্ড জিন (Howard Zinn,১৯২২-২০১০) ছিলেন একজন মার্কিন ইতিহাসবিদ, লেখক, নাট্যকার, এবং রাজনৈতিক কর্মী, যিনি মূলত ‘গণমানুষের ইতিহাস’ ধারণার জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত । তাঁর জীবন ও কর্ম ছিল আমেরিকার ইতিহাসকে প্রচলিত দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সাধারণ মানুষ, নিপীড়িত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চোখে দেখার এক নিরলস প্রয়াস।জীবন ও কর্মের মূল দিক:
হাওয়ার্ড জিন। জন্ম ২৪ আগস্ট, ১৯২২। মৃত্যু ২৭ জানুয়ারি, ২০১০। তাঁর একটি অবিস্মরণীয় কাজ হল ‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস্’ (A People's History of the United States) গ্রন্থের প্রণয়ন। তাঁর জীবনদর্শন হল : ইতিহাস চর্চাও একটি রাজনৈতিক কাজ। তাঁর মতে, ইতিহাসে নিরপেক্ষ থাকা যায় না। কারণ সমাজ সবসময়ই একটি নির্দিষ্ট দিকে এগিয়ে চলে।🗺️ জীবনের মূল পথপরিক্রমা
হাওয়ার্ড জিনের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে।· শৈশব ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা:
তিনি নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের এক শ্রমজীবী অভিবাসী ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি মার্কিন বিমান বাহিনীতে বোমারু হিসেবে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষে তিনি ফ্রান্সের রোয়ান শহরে তার অংশগ্রহণে ন্যাপালম (Napalm) বোমা হামলায় এক হাজারেরও বেশি বেসামরিক ফরাসি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা জানতে পারেন, যা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং আজীবন যুদ্ধবিরোধী করে তোলে।· শিক্ষাজীবন ও নাগরিক অধিকার আন্দোলন:
যুদ্ধের পর জি.আই. বিলের সুবাদে তিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন । ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি আটলান্টার ঐতিহাসিক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা কলেজ স্পেলম্যান কলেজে অধ্যাপনা করেন । এই সময় তিনি মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন, ছাত্রদের আন্দোলনে সমর্থন দেন এবং বর্ণবিদ্বেষী আইন ভাঙার আন্দোলনে অংশ নেন । এই কারণে ১৯৬৩ সালে তাকে স্পেলম্যান কলেজ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।· বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন:
স্পেলম্যান থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং ১৯৮৮ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন । ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের একজন শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন এবং যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারের দাবি জানান ।✍️ প্রধান সৃষ্টিকর্ম ও দর্শন
জিনের সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী বই হলো ‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস্’ (১৯৮০)। এই বইয়ে তিনি আমেরিকার ইতিহাসকে প্রচলিত নায়ক ও রাষ্ট্রনায়কদের দৃষ্টিকোণ থেকে না বলে, সাধারণ শ্রমিক, নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী আমেরিকান ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করেছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে এই বইটি মূলধারার ইতিহাসচর্চায় এক ভিন্ন স্রোতের সৃষ্টি করে।তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বই ও নাটকের মধ্যে রয়েছে You Can't Be Neutral on a Moving Train' (আত্মজীবনী), The Politics of History, এবং Marx in Soho' (নাটক) ।
তাঁর দর্শনের মূল বক্তব্য ছিল, ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনার ফিরিস্তি নয়, এটি বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যত পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার। ১৯৯৮ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি পণ্ডিত হওয়ার জন্য নয়... আমি ইতিহাসের লেখা ও অধ্যাপনাকে সামাজিক সংগ্রামের একটি অংশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম”।
🌟 প্রভাব ও মূল্যায়ন
হাওয়ার্ড জিনের কাজ লক্ষ লক্ষ পাঠকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা ম্যাট ডেমন, বেন অ্যাফ্লেক ও সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিনের মতো তাঁর অনেক ভক্ত ও অনুসারী ছিল ।তাঁর বন্ধু ও ভাষাবিদ নোম চমস্কি তাঁর সম্পর্কে বলেন, “আমি এমন কাউকে ভাবতে পারি না যার এত শক্তিশালী এবং কল্যাণকর প্রভাব ছিল। তাঁর ঐতিহাসিক কাজ লক্ষ লক্ষ মানুষের অতীত দেখার পদ্ধতি বদলে দিয়েছে”।
অবশ্য, তাঁর এই ‘গণমানুষের ইতিহাস’ ধারা ও বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তিনি ঐতিহাসিক মহলে সমালোচিতও হয়েছেন। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্থার এম. শ্লেসিঞ্জার জুনিয়র তাঁকে ‘ইতিহাসবিদ না হয়ে বিতর্ককারী’ (polemicist) হিসেবে আখ্যা দেন।
‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি’ বইয়ের মূল বক্তব্য
হাওয়ার্ড জিনের লেখা ‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস্’ (A People's History of the United States) বইটি আমেরিকার ইতিহাস চর্চায় একটি মাইলফলক। ১৯৮০ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটি প্রচলিত ইতিহাসের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সাধারণ মানুষ, নিপীড়িত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিকোণ থেকে আমেরিকার ইতিহাস পুনর্লিখন করে ।এটি কোনো ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণী নয়, বরং ইতিহাসকে দেখার একটি সম্পূর্ণ নতুন দর্শন ও কাঠামো প্রদান করে।
📚 বইটির মূল বক্তব্য ও তার ভিত্তি :
হাওয়ার্ড জিন প্রথম অধ্যায়েই তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে দেন। তিনি বলেন, ইতিহাস কখনো নিরপেক্ষ হয় না। ইতিহাস লেখাও একটি রাজনৈতিক কাজ, কারণ কোন্ ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হবে, তা লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে ।প্রচলিত ইতিহাস মূলত ‘বিজয়ীদের’ গল্প বলে, যেখানে রাষ্ট্রপতি, জেনারেল ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই প্রধান চরিত্র। জিন এই ধারার বিপরীতে গিয়ে ইতিহাসের ‘নীরব কণ্ঠস্বর’ - আদিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ, শ্রমিক, নারী, অভিবাসী - তাঁদের গল্প বলার চেষ্টা করেছেন ।
🗝️ মূল বক্তব্যের স্তর বিশ্লেষণ
বইটির মূল বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করলে তাঁর ইতিহাস দর্শন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যায়।শ্রেণীসংগ্রাম ইতিহাসের চালিকাশক্তি :
জিন মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্তুবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেখান যে, আমেরিকার ইতিহাস মূলত ধনী ক্ষমতাবান ‘এলিট’ শ্রেণি এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এই সংগ্রাম দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রমিক আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই এই দ্বন্দ্ব সক্রিয় ছিল ।প্রচলিত ইতিহাসের ‘পক্ষপাত’ উন্মোচন :
জিন যুক্তি দেন, মূলধারার ইতিহাসচর্চা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজান্তেই এলিট শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে। তাঁদের লেখা ইতিহাসে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মতো অভিযাত্রীদের বীর হিসেবে দেখানো হলেও, তাঁর হাতে সংঘটিত গণহত্যা ও নিপীড়নের কথা চাপা দেওয়া হয়েছে। জিন এই ‘সরকার-সমর্থিত ইতিহাসের’ বিপরীতে সত্য তুলে ধরতে চেয়েছেন। কলম্বাস আদিবাসীদের উপর যে বর্বরতা চালিয়েছিলেন, হাত কেটে দেওয়া, দাস বানানো—তা পাঠ্যপুস্তকে কখনোই স্থান পায় না।সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের গল্প :
বইটির কেন্দ্রীয় বার্তা হল, সাধারণ মানুষ কখনোই নিঃশেষিত ও অসহায় ছিল না। তারা সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, সংগঠিত হয়েছে এবং অনেক সময় জয়লাভ করেছে। জিন এই প্রতিরোধের ইতিহাসকে তুলে এনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছেন । রোজা পার্কের নেতৃত্বে মন্টগোমারি বাস বয়কট, শ্রমিক ধর্মঘট, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন—এসবই সাধারণ মানুষের শক্তির উদাহরণ ।আদিবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পদ বণ্টন :
জিন দেখান, ইউরোপীয়ানরা যখন আমেরিকায় আসে, তখন এখানকার আদিবাসী সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই বেশি প্রগতিশীল ছিল। তাঁরা ব্যক্তিগত সম্পদের পরিবর্তে সম্মিলিত মালিকানায় বিশ্বাস করত, যা সহিংসতা কমাত । জিন প্রশ্ন তোলেন, ‘সভ্যতা’র নামে এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল? আদিবাসীদের ভূমি ও সম্পদ দখলের জন্য ইচ্ছাকৃত সরকারি নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল ।যুদ্ধের সমালোচনা :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞ একজন বোমারু পাইলট হিসেবে জিন যুদ্ধের বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তিনি যুদ্ধকে ‘রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য’ বলে অভিহিত করে দেখান, কীভাবে যুদ্ধের নামে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এলিট শ্রেণির স্বার্থসিদ্ধি করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সবচেয়ে ‘জনপ্রিয়’ যুদ্ধ বলেও তিনি এই ধারণা তৈরির কৃত্রিমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মাই লাই গণহত্যার মতো ঘটনা সাধারণ সৈনিকদের মনে কী প্রভাব ফেলেছিল, তাও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন ।✍️ উপসংহার: ইতিহাসের বিকল্প ধারা
হাওয়ার্ড জিনের ‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি’ শুধু একটি ইতিহাসের বই নয়, এটি ইতিহাস চর্চার একটি রাজনৈতিক বিবৃতিও বটে। তিনি স্বীকার করেছেন যে তাঁর বই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা—যা ক্ষমতাহীন মানুষের পক্ষে কথা বলে।তাঁর মূল বক্তব্য হলো, আমেরিকার প্রকৃত ইতিহাস বোঝার জন্য শুধু সাদা চামড়ার ধনী পুরুষদের গল্প পড়া যথেষ্ট নয়। বরং, ইতিহাসের পাতা থেকে যাদের ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে, তাঁদের গল্প শোনাই প্রকৃত সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর পথ।
----------xx-----------
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন