সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আর এস এস-এর বিপদ, এবং বাংলা ভাষা ও বাঙালির সংকট

আর এস এস-এর বিপদ, এবং বাংলা ভাষা ও বাঙালির সংকট

আর এস এস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের উত্থান এবং তাদের আদর্শিক বিস্তার একবিংশ শতাব্দীর ভারতের সমাজনীতি ও রাজনীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে 'হিন্দুত্ব' এবং 'সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ', যা ভারতের মতো একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর এক বিশেষ ধরনের একরৈখিক পরিচয় আরোপ করতে চায় । পশ্চিমবঙ্গ এবং বাঙালি জাতিসত্তা ঐতিহাসিকভাবেই এক স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভাষাগত অবস্থানে বিরাজমান। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের সমসাময়িক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সঙ্ঘের এই আদর্শিক অগ্রযাত্রা বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের সামনে এক গভীর সংকটের দেওয়াল তুলে দিয়েছে । এই সংকট কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির ভাষাগত সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের লালিত বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর এক সুপরিকল্পিত আঘাত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে ।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আর এস এস): আদর্শিক উৎস এবং বিস্তৃতির কৌশল

১৯২৫ সালে কেশব বলীরাম হেডগেওয়ার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আর এস এস-এর মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের সংগঠিত করা এবং ভারতের জাতীয় পরিচিতিকে হিন্দুত্বের ছাঁচে ঢেলে সাজানো । সঙ্ঘের এই লক্ষ্য ভি ডি সাভারকরের 'হিন্দুত্ব' তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত, যা ভারতকে কেবল একটি রাজনৈতিক ভৌগোলিক একক হিসেবে নয়, বরং একটি পবিত্র 'হিন্দু রাষ্ট্র' হিসেবে কল্পনা করে । সঙ্ঘের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাটি কেবল নির্বাচনী রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি; বরং এটি সমাজের গভীরে প্রবেশ করে সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যাকে 'লঁ দ্যুরে' (Longue durée) হিসেবে অভিহিত করা যায় ।

সঙ্ঘের শক্তি তার শাখা কাঠামোর মধ্যে নিহিত, যা প্রতিদিনের শরীরচর্চা, প্রার্থনা এবং আদর্শিক আলোচনার মাধ্যমে একনিষ্ঠ ক্যাডার তৈরি করে। পশ্চিমবঙ্গে সঙ্ঘের এই সাংগঠনিক বিস্তার গত এক দশকে বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণায় দেখা যায় যে, ২০১১ সালে রাজ্যে সঙ্ঘের শাখার সংখ্যা যেখানে ছিল প্রায় ১,০০০, ২০২৪ সাল নাগাদ তা দ্বিগুণ হয়ে ২,০০০-এ পৌঁছেছে । এই বিস্তার বিশেষ করে জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ এবং সুন্দরবনের মতো পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে সঙ্ঘের শাখা সংগঠনগুলো শিক্ষা ও সমাজসেবার আড়ালে তাদের আদর্শিক বীজ বপন করছে ।

| সঙ্ঘের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার (পশ্চিমবঙ্গ প্রেক্ষাপট) | ২০১১ (আনুমানিক) | ২০২৪ (প্রক্ষেপণ) |
| :--- | :--- | :--- |
| শাখার সংখ্যা | ১,০০০ | ২,০০০ |
| সঙ্ঘ-পরিচালিত স্কুল (সরস্বতী শিশু মন্দির) | ১০০ | ৩০০+ |
| স্থায়ী সমাজসেবা প্রকল্প | < ১০০ | ৬০০+ |
| সক্রিয় সদস্য সংখ্যা (সমগ্র ভারতে) | - | ৪.৫ মিলিয়ন |


সঙ্ঘের এই আধিপত্য বিস্তারের কৌশলে 'পোস্ট-ট্রুথ' (Post-truth) বা সত্য-পরবর্তী রাজনীতির এক ব্যাপক প্রয়োগ দেখা যায়, যেখানে প্রচারের মাধ্যমে একটি কৃত্রিম সত্যের বাতাবরণ তৈরি করা হয় । কোনো কোনো বিশ্লেষক সঙ্ঘের এই কর্মপদ্ধতিকে নাৎসি জার্মানির প্রচার কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা নির্দিষ্ট জনসমষ্টিকে 'অন্য' (Other) হিসেবে চিহ্নিত করে সংখ্যাগুরুর মনে এক ধরনের ভীতি ও শ্রেষ্ঠত্ববাদ সঞ্চার করে ।

১) হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান: ভাষাগত আধিপত্যবাদের রূপরেখা

সঙ্ঘের 'এক জাতি, এক সংস্কৃতি' স্লোগানের সমান্তরালে রয়েছে 'এক ভাষা'র দাবি। হিন্দি ভাষাকে ভারতের একমাত্র সাধারণ জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এই রাজনৈতিক প্রচেষ্টাকে অনেক ভাষাবিদ ‘হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন । আর এস এস-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অরুণ কুমার ২০২৫ সালে এক বক্তৃতায় উল্লেখ করেন যে, ভারতের প্রশাসনিক ঐক্যের জন্য একটি সাধারণ ভাষা প্রয়োজন এবং সংস্কৃত এখন সম্ভব নয় বলে হিন্দিই সেই স্থানটি গ্রহণ করতে পারে । সঙ্ঘের মতে, হিন্দি হবে সেই সেতু যা সমগ্র ভারতকে যুক্ত করবে, কিন্তু অহিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর জন্য এই দাবি এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে ।

২) জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০ এবং তার ত্রি-ভাষা সূত্র

জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০ এবং তার ত্রি-ভাষা সূত্র (Three-language formula) এই ভাষাগত রাজনীতির একটি বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে । সমালোচকদের মতে, এই নীতির আড়ালে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর ওপর পরোক্ষভাবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে । পশ্চিমবঙ্গে এর প্রতিক্রিয়ায় রাজ্য সরকার নিজস্ব শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে, যেখানে বাংলা ভাষাকে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে । ভাষাগত এই দ্বন্দ্ব কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে।

| ভারতের ভাষাগত চিত্র ও হিন্দি আধিপত্যের দাবি | পরিসংখ্যান / তথ্য |
|---|---|
| হিন্দিভাষী জনসংখ্যা (২০১১ সেন্সাস অনুযায়ী) | ৪৪% (দাবি করা হয়) |
| হিন্দি বলয়ের বাইরে প্রকৃত হিন্দি ব্যবহারকারী | অনেক কম (যদি উপভাষাগুলো বাদ যায় তবে ৩৪%) |
| বাংলা ভাষার অবস্থান (ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা) | ৮% এর অধিক |
| বিপন্ন ভারতীয় ভাষার শতাংশ | ৪০% এর বেশি |
| | |
গণেশ দেবীর মতো বিশিষ্ট ভাষাবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ভাষার এই একরৈখিক আধিপত্য ভারতের বৈচিত্র্যময় ঐক্যকে ধ্বংস করতে পারে । সঙ্ঘের এই 'হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান' প্রকল্প বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ভাষাগত মর্যাদাকে অবদমিত করার এক প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বাঙালির নিজস্ব সাহিত্যিক আভিজাত্য এবং সাংস্কৃতিক অহংকারকে ‘আঞ্চলিক’ বা ‘প্রাদেশিক’ বলে ছোট করার চেষ্টা করা হয় ।

৩) ২০২৫-এর সংকট: পরিযায়ী শ্রমিক এবং ‘বাংলাদেশি’ পরিচিতির জুজু

বাঙালির বর্তমান সংকটের এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর দিক হলো বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। ২০২৫ সালে ভারতের বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে, বিশেষ করে ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং দিল্লিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের ওপর এক সুপরিকল্পিত 'ক্র্যাকডাউন' শুরু হয় । কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে বহু বৈধ ভারতীয় নাগরিককে 'অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বা 'রোহিঙ্গা' হিসেবে দেগে দেওয়া হয়েছে ।
এই সংকট কেবল ভাষাগত পরিচয়ের নয়, বরং এটি মানবাধিকার এবং নাগরিকত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। ২০২৫ সালের জুন-জুলাই মাসে ওড়িশার ঝারসুগুড়া এবং খুরদার মতো অঞ্চল থেকে শত শত বাঙালি রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিককে আটক করা হয় । বীরভূম জেলার ছয়জন বাসিন্দাকে, যার মধ্যে আট মাসের গর্ভবতী নারীও ছিলেন, কোনো বিচার বিভাগীয় নির্দেশ ছাড়াই বাংলাদেশে 'পুশব্যাক' করার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটেছে । পরবর্তীতে বাংলাদেশ আদালত এবং ভারতীয় নথিপত্র প্রমাণ করে যে তারা জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক ।

| ২০২৫-এর পরিযায়ী শ্রমিক ও নাগরিকত্ব সংকটের তথ্যচিত্র | বিবরণ |

|---|---|
| ওড়িশায় আটক বাংলাভাষী শ্রমিকের সংখ্যা (জুন-জুলাই ২০২৫) | ৪৪৭ জন |
| নির্যাতিত শ্রমিকদের প্রধান জেলাগুলো | বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা |
| অভিবাসনের কারণ (পশ্চিমবঙ্গ থেকে) | ৬২.৮৭% উন্নত কর্মসংস্থানের আশায় |
| শিক্ষাগত প্রভাব | ৬০.২৩% পরিযায়ী শ্রমিকের পড়ালেখা অকালে বন্ধ হয়েছে |
| | |

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিস্থিতিকে ‘ভাষাগত সন্ত্রাস’ (Linguistic terrorism) হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে সঙ্ঘের মদতে রাজ্যগুলোকে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে মেরুকরণ করা হচ্ছে । কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়ে একাধিক পিটিশন দায়ের করা হয়েছে, যেখানে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে কেবল একটি ভাষায় কথা বলা কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি হতে পারে না । কিন্তু সঙ্ঘের আদর্শে অনুপ্রাণিত সংগঠনগুলো এই 'অনুপ্রবেশকারী' তত্ত্বকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে এক গভীর সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করতে চাইছে ।

বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং প্রতিরোধের পরম্পরা

সঙ্ঘের এই আগ্রাসনের মোকাবিলায় বাঙালির প্রধান অস্ত্র হলো তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরম্পরা এবং রেনেসাঁসের উত্তরাধিকার। উনিশ শতকের বেঙ্গল রেনেসাঁস বা বাংলার নবজাগরণ বাঙালির মনে এক আধুনিক, যুক্তিবাদী এবং ধর্মমনিরপেক্ষ পরিচয়ের জন্ম দিয়েছিল । রাজা রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সুভাষচন্দ্র বসুর আদর্শ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সর্বদা এক অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ প্রদান করেছে।

বাঙালির এই জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হলো তার ভাষা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছিল যে, ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভাষাগত ঐক্য অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে । বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে সঙ্ঘের হিন্দুত্বের মোকাবিলায় এই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ পুনরায় এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতীকের ব্যবহার আসলে সঙ্ঘের ‘জয় শ্রী রাম’ রাজনীতির এক পাল্টাপথ।

তবে এই প্রতিরোধের এক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কোনো কোনো তাত্ত্বিক মনে করেন যে, বাঙালির এই গর্ব অনেক সময় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের শ্রেষ্ঠত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমানদের কিছুটা হলেও প্রান্তিক করে রাখে। সঙ্ঘ এই ফাটলটিকেই ব্যবহার করতে চায়। তারা দলিত এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে যাতে তৃণমূলের বাঙালি পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির এক অভ্যন্তরীণ বিকল্প তৈরি করা যায় ।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট: সঙ্ঘের আদর্শিক অনুপ্রবেশের জমি

বাঙালির এই সাংস্কৃতিক সংকটের পেছনে এক গভীর অর্থনৈতিক কারণও বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) এবং প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে যে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তা বাঙালির শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিয়েছে । ২০২৫ সালে প্রায় ২৬,০০০ শিক্ষকের চাকরি বাতিলের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ এবং তার পরবর্তী আন্দোলন রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে টালমাটাল করে দিয়েছে ।
সঙ্ঘের জন্য এই অরাজকতা এক সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে এসেছে। যখন রাজ্যের যুবসমাজ বেকারত্ব এবং দুর্নীতির কারণে দিশেহারা, তখন সঙ্ঘ তাদের শাখা এবং বিভিন্ন সেবা সংগঠনের মাধ্যমে এক বিকল্প শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে । এছাড়া রাজ্যের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতির সুযোগ নিয়ে সঙ্ঘ পরিচালিত ‘সরস্বতী শিশু মন্দির’ বা ‘বিদ্যা ভারতী’ স্কুলগুলো প্রান্তিক অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে । এই স্কুলগুলোতে শিশুদের মনে ছোটবেলা থেকেই এক বিশেষ ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস এবং আদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা বাঙালির প্রথাগত উদারবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত ।

| পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ও সামাজিক সংকটের মূলবিন্দু (২০২৫) | তথ্য |
|---|---|
| SSC ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে বাতিল চাকরি | ২৫,৭৫৩ জন |
| ২০২৫-এর প্রধান শিক্ষক আন্দোলন কর্মসূচি | ২৮ জুলাই 'নবান্ন চলো' |
| পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য রাজ্য সরকারের প্রকল্প | 'শ্রমশ্রী' (৫০০০ টাকা ভাতা) |
| নির্বাচনী তালিকায় নাম বাদ পড়ার উদ্বেগ (SIR) | ৫৮ লক্ষের বেশি নাম কাটা পড়েছে |
| | |

এই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় বাঙালির মনে এক ধরনের পরিচয়হীনতা তৈরি করছে, যা সঙ্ঘের মতো ক্যাডার-ভিত্তিক সংগঠনের জন্য আদর্শ ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ।

সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন: উৎসবের রাজনীতি এবং ‘মাস্কুলার হিন্দুত্ব’

সঙ্ঘের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো উৎসবের রাজনীতি। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা হলেও, সঙ্ঘ গত কয়েক বছরে রামনবমী এবং হনুমান জয়ন্তীকে এক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে । তারা বাঙালির ঐতিহ্যের 'কোমল ও ভক্তিপূর্ণ' রামের পরিবর্তে এক 'পেশিবহুল, যোদ্ধা ও ক্রুদ্ধ' রামের চিত্র তুলে ধরছে, যা বাঙালির চিরায়ত ধর্মীয় আচারের সঙ্গে মেলে না । এই উৎসবগুলোর শোভাযাত্রায় তলোয়ার এবং আগ্নেয়াস্ত্রের প্রদর্শন সঙ্ঘের এক ধরনের 'পৌরুষদীপ্ত হিন্দুত্ব' বা 'মাস্কুলার হিন্দুত্ব' প্রদর্শনের মাধ্যম ।
বিপরীতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস 'মা-মাটি-মানুষ' এবং 'বাঙালি অস্মিতা'র কথা বলছে। দুর্গাপূজাকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এনে দেওয়া এবং দুর্গাপূজা কমিটির অনুদান বৃদ্ধি করে তারা সঙ্ঘের রামনবমী রাজনীতির মোকাবিলা করতে চায় । কিন্তু এর ফলে এক ধরনের 'প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্ব' তৈরি হয়েছে, যেখানে সঙ্ঘের রাজনৈতিক পরিভাষাগুলোই মূলধারার রাজনীতিতে বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে ।

খাদ্যাভ্যাস এবং আচারের ক্ষেত্রেও সঙ্ঘের একরৈখিকতা বাঙালির সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ একটি আমিষভোজী প্রধান রাজ্য, যেখানে ৯৮.৫৫% মানুষ মাছ বা মাংস খায় । সঙ্ঘ এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলো প্রায়ই নবরাত্রির সময় আমিষ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করে, যা বাঙালির খাদ্যাধিকার এবং সংস্কৃতির ওপর এক সরাসরি আঘাত । আর এস এস প্রধান মোহন ভাগবত আমিষ ভক্ষণকারীদের 'সংযম' পালনের পরামর্শ দিয়েছেন, যা পরোক্ষভাবে নিরামিষাশী উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিপন্ন করার প্রয়াস ।

বাংলা পক্ষ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উগ্র ও প্রগতিশীল ধারা

সঙ্ঘের 'হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ' এবং হিন্দুত্বের আগ্রাসনের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গে 'বাংলা পক্ষ'-এর মতো কিছু সংগঠন গত কয়েক বছরে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে । গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই সংগঠনটি বাঙালির অর্থনৈতিক ও ভাষাগত অধিকার নিয়ে লাগাতার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মূল বক্তব্য হলো, উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দি ভাষা বাঙালির ওপর জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং এর ফলে বাঙালি তার নিজের রাজ্যেই কর্মসংস্থান ও সম্মানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে ।
বাংলা পক্ষ-এর প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
  • ১. পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমস্ত চাকরিতে ১০০% এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে ৯০% ভূমিপুত্র সংরক্ষণ ।
  • ২. ব্যাঙ্কিং, রেল এবং সিএপিএফ নিয়োগ পরীক্ষায় বাংলা ভাষাকে আবশ্যিক করা ।
  • ৩. হিন্দি বলয় থেকে আসা মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং 'বহিরাগত' তত্ত্বকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা ।
তবে বাংলা পক্ষ-এর কিছু কার্যকলাপ সমালোচনার মুখেও পড়েছে। হিন্দিভাষী মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ এবং সোশাল মিডিয়ায় 'গুটখা বলয়' বা 'গুটখা সন্ত্রাসী'র মতো শব্দবন্ধের ব্যবহার এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য হুমকি হতে পারে । সমালোচকদের মতে, সঙ্ঘের উগ্র হিন্দুত্বের পাল্টা হিসেবে এই ধরনের উগ্র ভাষাগত জাতীয়তাবাদ হিতে বিপরীত হতে পারে ।

বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি: অমর্ত্য সেন এবং সঙ্ঘের আদর্শগত সীমাবদ্ধতা

বাঙালির এই সংকটে বিশিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজও নিশ্চুপ নেই। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বারবার সতর্ক করেছেন যে, ভারতকে একটি 'হিন্দু রাষ্ট্র' হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সুভাষচন্দ্র বসুর স্বপ্নের বিরোধী । তার মতে, বাঙালির প্রকৃত শক্তি তার 'যুক্তিবাদী' (Argumentative) ঐতিহ্য এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত । সেনের মতে, বর্তমান সরকারের নীতি দরিদ্র ও সংখ্যালঘুদের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ এবং সঙ্ঘের এই হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প ভারতের প্রকৃত পরিচিতিকে ধ্বংস করছে ।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিটার রোনাল্ড ডি'সুজা মনে করেন যে, সঙ্ঘের এই 'সাংস্কৃতিক বুলডোজার' পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এক বড় বাধার সম্মুখীন হবে, কারণ বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পদ অনেক বেশি লোকজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক । সঙ্ঘের 'আমরা বনাম ওরা'র সরলীকরণ বাংলার মিশ্র সংস্কৃতির (Joint us-them) কাছে পরাজিত হতে পারে । সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত দাবি করেছেন যে স্বাধীনতা মানে কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, বরং নিজস্ব ঐতিহ্যে ফেরা, কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন সঙ্ঘের এই 'ঐতিহ্য' আসলে এক সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক সংস্করণ ।

২০২৬-এর নির্বাচনী রণক্ষেত্র এবং বাঙালির ভবিষ্যৎ

২০২৫ সালের ঘটনাবলি এবং ২০২৬ সালের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে । বিজেপি যেখানে হিন্দু ধর্মকে বিপন্ন দাবি করে এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের ভয় দেখিয়ে ভোট চাইছে, তৃণমূল সেখানে 'বাঙালি অস্মিতা' এবং কেন্দ্রের বঞ্চনাকে প্রধান ইস্যু করছে ।

| ২০২৬-এর নির্বাচনের সম্ভাব্য চালিকাশক্তি | ইস্যু ও প্রভাব |
|---|---|
| ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (SIR) | ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়া নিয়ে ব্যাপক আতঙ্ক ও রাজনৈতিক সংঘাত |
| পরিযায়ী শ্রমিক সংকট | ভাষাগত জাতীয়তাবাদ এবং কেন্দ্রীয় বঞ্চনার বয়ান |
| নিয়োগ দুর্নীতি (SSC Scam) | সরকার বিরোধী হাওয়া এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ |
| সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ | সঙ্ঘের 'সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ব' বনাম তৃণমূলের 'আঞ্চলিক অস্মিতা' |
| | |

নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ২০২১ সালে তৃণমূল ২২৩টি আসন জিতে একাধিপত্য বজায় রাখলেও ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন এবং তার পরবর্তী উপ-নির্বাচনগুলোতে বিজেপির ভোটব্যাংক কিছুটা কমলেও সঙ্ঘের আদর্শিক প্রচার কিন্তু কমেনি । সঙ্ঘ এখন সরাসরি ভোটের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাঙালির চিন্তা ও মনন পরিবর্তনের ওপর ।

উপসংহার: বাঙালি জাতিসত্তার উত্তরণের পথ

আর এস এস-এর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিপদ এবং বাঙালির ভাষাগত ও অর্থনৈতিক সংকট বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। সঙ্ঘের 'এক জাতি, এক ভাষা, এক ধর্ম'র আদর্শ ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বাঙালির হাজার বছরের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের পরিপন্থী । বাংলা ভাষাকে 'ধ্রুপদী' মর্যাদা দেওয়া হলেও, যদি প্রশাসনিক এবং কর্মসংস্থানের স্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত না হয়, তবে এই মর্যাদা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে ।

বাঙালির এই সংকট থেকে মুক্তির পথ কেবল স্লোগানে নেই, বরং তা নিহিত রয়েছে এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের মধ্যে। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, বাংলাকে এমন কোনো শক্তির হাতে দেওয়া উচিত নয় যারা সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় । বাঙালির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে একদিকে যেমন হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, অন্যদিকে তেমনি নিজের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সঙ্ঘের আদর্শিক সংকীর্ণতার বিপরীতে বাঙালির উদার, যুক্তিবাদী এবং মানবিক জাতীয়তাবাদই হতে পারে আগামীর প্রকৃত দিশারি। বাঙালির এই লড়াই কেবল ভৌগোলিক সীমানা রক্ষার নয়, এটি একটি উন্নততর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই ।

মন্তব্যসমূহ

📂 আলী হোসেনের জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলি

হিন্দু কারা? তারা কীভাবে হিন্দু হল?

হিন্দু কারা? কীভাবে তারা হিন্দু হল? যদি কেউ প্রশ্ন করেন, অমিত শাহ হিন্দু হলেন কবে থেকে? অবাক হবেন তাই তো? কিন্তু আমি হবো না। কারণ, তাঁর পদবী বলে দিচ্ছে উনি এদেশীয়ই নন, ইরানি বংশোদ্ভুত। কারণ, ইতিহাস বলছে পারস্যের রাজারা ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এবং ‘শাহ’ শব্দটি পার্শি বা ফার্সি। লালকৃষ্ণ আদবানির নামও শুনেছেন আপনি। মজার কথা হল আদবানি শব্দটিও এদেশীয় নয়। আরবি শব্দ ‘আদবান’ থেকে উদ্ভূত। সুতরাং তাঁর পদবীও বলছে, তিনিও এদেশীয় নন। ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চবর্ণের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মানুষদের, উৎসভূমি হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। তারও আগে ছিল ইউরোপের ককেশাস অঞ্চলে। আসলে এরা (উচ্চবর্ণের মানুষ) কেউই এদেশীয় নয়। তারা নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয়ে তারা গর্ববোধ করতেন। সিন্ধু সভ্যতা পরবর্তীকালে তারা পারস্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ ধরে এদেশে অভিবাসিত হয়েছেন। আর মধ্যযুগে এসে এদেরই উত্তরসূরী ইরানিরা (অমিত শাহের পূর্বপুরুষ) অর্থাৎ পারস্যের কিছু পর্যটক-ঐতিহাসিক, এদেশের আদিম অধিবাসীদের ’হিন্দু’ বলে অভিহিত করেছেন তাদের বিভিন্ন ভ্রমণ বৃত্তান্তে। ...

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন আলী হোসেন  যদি প্রশ্ন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী? মনে হয় অনেকেই ঘাবড়ে যাবেন। কেউ বলবেন, তাঁর বাবা যখন ব্রাহ্ম ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্ম হবেন। যারা লেখাপড়া জানেন না, তারা বলবেন, কেন! উনি তো হিন্দু ছিলেন। আবার কেউ কেউ তথ্য সহযোগে এও বলার চেষ্টা করবেন যে, উনি নাস্তিক ছিলেন। না হলে কেউ বলতে পারেন, ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো?¹ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ভাবনার বিবর্তন  তাহলে সঠিক উত্তরটা কী? আসলে এর কোনোটাই সঠিক উত্তর নয়। চিন্তাশীল মানুষ-মাত্রই সারা জীবন ধরে ভাবতে থাকেন। ভাবতে ভাবতে তাঁর উপলব্ধি এগোতে থাকে ক্রমশঃ প্রগতির পথে। এই সময়কালে জগৎ ও জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একে একে গড়ে তোলেন জীবনদর্শনের নিত্যনতুন পর্ব। তাই এ ধরনের চিন্তাশীল মানুষ আজীবন এক এবং অখণ্ড জীবনদর্শনের বার্তা বহন করেন না। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় তাঁর পথচলার গতিমুখ, গড়ে ওঠে উন্নততর জীবন দর্শন। মানুষ রবীন্দ্রনাথও তাই পাল্টে ফেলেছেন তাঁর জীবন ও ধর্মদর্শন; সময়ের এগিয়ে যাওয়াকে অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথ ও  হিন্দু জাতীয়তাবাদ ১৮৬১ সালের ৭ই মে সোমবার রাত্রি ২টা ৩৮ ...

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি - লিখছেন আলী হোসেন  কপালের লেখন খণ্ডায় কার সাধ্য? জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কিংবা লেখাপড়া জানা-নাজানা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কথাটা মেনে নেয়। জীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাসে কপালের লেখনকে জায়গা করে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং বলা ভালো এব্যাপারে তারা অতিমাত্রায় উদার। মানুষের মনস্তত্বের এ-এক জটিল স্তর বিন্যাস। একই মানুষ বিভিন্ন সময়ে একই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণে ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে। এ রকমই একটি দৃষ্টিকোণ হলো কপাল বা ভাগ্যের ভূমিকাকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে ভাবা। কখনও সে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, আবার কখনও নিজেই ভাগ্যের কাছে নির্দিধায় আত্ম সমর্পন করে। নিজের ব্যার্থতার পিছনে ভাগ্যের অদৃশ্য হাতের কারসাজির কল্পনা করে নিজের ব্যার্থতাকে ঢাকা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। মজার কথা, এক্ষেত্রে মুসলিম মানসের মনস্তত্ত্ব কখনও চেতনমনে আবার কখনও অবচেতন মনে উপরওয়ালাকে (আল্লাহকে) কাঠ গড়ায় তোলে বিনা দ্বিধায়। নির্দিধায় বলে দেয়, উপরওয়ালা রাজি না থাকলে কিছুই করার থাকেনা। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সবই তাঁর (আল...

সীমান্ত আখ্যান, বাঙালির আত্মানুসন্ধানের ডিজিটাল আখ্যান

সময়ের সঙ্গে সমস্যার চরিত্র বদলায়। কিন্তু মুলটা বদলায় না। যদি সে সমস্যা ইচ্ছা করে তৈরি হয়ে থাকে বিশেষ সুবিধা ভোগেই লোভে, তবে তো অন্য কথা চলেই না। স্বনামধন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারের ডকুমেন্টারি ফিল্প 'সীমান্ত আখ্যান' দেখার পর এই উপলব্ধি মাথা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখলাম, দেশ ভাগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যার অবসান হয়নি। শুধু সমস্যার চরিত্রটা পাল্টেছে। এই যে সমস্যা রয়ে গেল, কোন গেল? তার উত্তর ও পাওয়া গেল 'সীমান্ত আখ্যান' এ। আসলে দেশ ভাগ তো দেশের জনগণ চাননি, চেয়েছেন দেশের নেতারা। চেয়েছেন তাঁদের ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত সুবিধাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার নেশায়। আর এই নেশার রসদ যোগান দিতে পারার নিশ্চয়তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে থাকার ওপর। তাই রাজনীতিকরা এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য জনগণকে 'ডিভাইড এন্ড রুল' পলিছি দ্বারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন। এ সমস্যা নতুন না, ব্রিটিশ সরকার এর বীজ রোপণ করে গেছেন, এখন কেউ তার সুফল ভোগ করছে (রাজনীতিকরা) আর কেউ কুফল (জনগন)। 'সীমান্ত আখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দে...

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের ভাগ্যলিপিতে লেখা হয়ে গেছে এই বিখ্যাত প্রবাদটির বিস্তারিত সারাৎসার। একদিকে পাকিস্তান আর অন্যদিকে ভারত – এই দুই প্রতিবেশি দেশের ভুরাজনৈতিক স্বার্থের যাঁতাকলে পড়ে তাদের এই হাল। কিন্তু কেন এমন হল? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না এমন মানুষ ভুভারতে হয়তো বা নেই। কিন্তু সেই জানার মধ্যে রয়েছে বিরাট ধরণের ফাঁক। সেই ফাঁক গলেই ঢুকেছে কাশ্মির ফাইলসের মত বিজেপির রাজনৈতিক ন্যারেটিভ যা তারা বহুকাল ধরে করে চলেছে অন্য আঙ্গিকে। এবার নতুন মাধ্যমে এবং নবরূপে তার আগমন ঘটেছে, যায় নাম সিনেমা বা সেলুলয়েড প্রদর্শনী। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সৌজন্যে অনেক আগেই সফলভাবে তারা এই ন্যারেটিভ দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করে চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। টেলিভিশন সম্প্রচারে কর্পোরেট পুজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যার সূচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রশক্তিকে কুক্ষিগত করতে না পারলে দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব নয়, একথা সাধারণ নিরক্ষর নাগরিক এবং ত...

শিক্ষা কী, কেন প্রয়োজন এবং কীভাবে অর্জন করা যায়?

শিক্ষা কী, কেন এবং কীভাবে অর্জন করতে হয়? সূচিপত্র : What is education, why it is needed and how to achieve it শিক্ষা কী শিক্ষা হল এক ধরনের অর্জন, যা নিজের ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে নিজে নিজেই নিজের মধ্যে জমা করতে হয়। প্রকৃতি থেকেই সেই অর্জন আমাদের চেতনায় আসে। সেই চেতনাই আমাদের জানিয়ে দেয়, জগৎ ও জীবন পরিচালিত হয় প্রকৃতির কিছু অলংঘনীয় নিয়ম-নীতির দ্বারা। গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ শক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজে লাগালেই এই নিয়মনীতিগুলো আমাদের আয়ত্বে আসে। এই নিয়ম-নীতিগুলো জানা এবং সেই জানার ওপর ভিত্তি করেই জগৎ ও জীবনকে সর্বোত্তম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার পথ খুঁজে বের করার শক্তি অর্জনই শিক্ষা। মনে রাখতে হবে, এই শিক্ষা কখনও কারও মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন হল, শিক্ষা অর্জনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিটা আসলে কী। সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে জানতে হবে, এই শিক্ষার সূচনা হয় কখন এবং কীভাবে? শিক্ষার সূচনা কখন হয় : এই অর্জনের সূচনা হয় মাতৃগর্ভে এবং তা প্রাকৃতিক ভাবেই। প্রকৃতির দেওয়া কিছু সহজাত শিক্ষাকে অবলম্বন করেই তার সূচনা। এই সহজাত শিক্ষাকে অবলম্বন করেই মানুষ তার পরবর্তী প...

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন আলী হোসেন বিচার একটি যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। বিচারক কখনই সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না, যদি না এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা ও তার কর্মকর্তারা উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং বিচারককে তা সরবরাহ করতে পারেন। আর বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি শক্তির আধার; তা যার হাতে থাকে, তিনিই বিচারক। এই শক্তি ন্যায়বিচার তখনই দিতে পারে, যখন বিচারক নিরপেক্ষ থাকার সৎ সাহস দেখান এবং সাংবিধানিক আইন এবং তার প্রয়োগ বিষয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তবে তাঁর সফলতা নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনজীবীরা কতটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই তথ্য বিচারকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তার উপর। তাই একজন বিচারক বা বিচার ব্যবস্থা যা বিধান দেয়, তা সব সময় একশ শতাংশ সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হবে - এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো একটি পক্ষ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে ন্যায় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, ...

জল, না পানি : জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয়

জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয় আলী হোসেন  সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে চিত্র শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য পানি শব্দকে বাংলা নয় বলে দাবি করেছেন। বলেছেন, "আমরা কোনোদিন কখনও বাংলা ভাষায় পানি (শব্দটা) ব্যবহার করি না"। শুধু তা-ই নয়, পানি শব্দের ব্যবহারের মধ্যে তিনি 'সাম্প্রদায়িকতার ছাপ'ও দেখতে পেয়েছেন। প্রশ্ন হল - এক, এই ভাবনা কতটা বাংলা ভাষার পক্ষে স্বাস্থ্যকর এবং কতটা 'বাংলা ভাষার ইতিহাস' সম্মত? দুই, জল বা পানি নিয়ে যারা জলঘোলা করছেন তারা কি বাংলাকে ভালোবেসে করছেন? মনে হয় না। কারণ, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা কেউ নিজের সন্তানকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াননি বা পড়ান না। ব্যবহারিক জীবনেও তারা বাংলার ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে বা গান শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, বলা ভালো গর্ববোধ করেন। প্রসংগত মনে রাখা দরকার, বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যারা ভর্তি হয়, তারা অধিকাংশই গরীব ঘরের সন্তান। বলা ভালো, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তারাই বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ, সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর পাশাপাশি, বা...

নিম্নবর্গের মানুষ মার খাচ্ছে কেন

নিম্নবর্গের মানুষ কীভাবে পিছিয়ে পড়েছেন? সমাধান কীভাবে? এদেশের নিম্নবর্গের মানুষ নিজেদের বাঁচাতে যুগ যুগ ধরে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। কখনও বৌদ্ধ (প্রাচীন যুগ), কখনও মুসলমান (মধুযুগ), কিম্বা কখনো খ্রিস্টান (আধুনিক যুগ) হয়েছে। কিন্তু কখনই নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে পাল্টানোর কথা ভাবেনি। পরিবর্তন হচ্ছে অলংঘনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম। যারা এই নিয়ম মেনে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, তারাই লাভবান হয়, টিকে থাকে। “পাল্টে গেলেই জীবন বাড়ে না পাল্টালে নয়, জীবন মানেই এগিয়ে যাওয়া নইলে মৃত্যু হয়” জীবনের এই চরম সত্য তারা অধিকাংশই উপলব্ধি করতে পারেনি। পৃথিবীর যেকোন উন্নত জাতির দিকে তাকান, তারা দ্রুততার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে মেনে নিজেদেরকে পুনর্গঠন করে নিয়েছে। যারা পারেনি বা নেয়নি তারাই মার খাচ্ছে, অতীতেও খেয়েছে। বুদ্ধিমান জাতি নিজের দুর্বলতাকে মেনে নেয় এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময়ের সঙ্গে তাল রেখে নিজেদের চিন্তা এবং চেতনায় পরিবর্তন আনে। খ্রিষ্টান, ইহুদি-সহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জাতি - যারাই এই পরিবর্তন মেনে নিয়েছে তারাই আরও উন্নত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মহানবীর (সঃ) গৌরবময় উত্থান (যা এক ধরণ...

আধুনিক মিডিয়া : কর্পোরেট পুঁজির (পুঁজিপতিদের) তোতাপাখি

গোদি মিডিয়া : কর্পোরেট পুঁজির তোতাপাখি পশ্চিমী মিডিয়াকে 'ইসরাইল সরকারের তোতাপাখি' নামে পরিচয় দেওয়া হয় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মিডিয়া হাউজের পক্ষ থেকে। সম্প্রতি একইভাবে ভারতীয় কর্পোরেট মিডিয়া ভারত সরকার তথা 'কর্পোরেট পুঁজির  তোতাপাখি' হিসাবে পরিচয় পাচ্ছে, যাকে নিন্দুকেরা 'গোদী মিডিয়া' নামে অভিহিত করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা সম্পর্কে ইসরাইল যা বলে, ইউরোপ ও আমেরিকার মিডিয়া, তোতা পাখির মতো তা-ই প্রচার করে। সাংবাদিকতার প্রধান প্রধান শর্তগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরাইলের দেওয়া তথ্যই তারা প্রচার করে অন্ধ ও নির্লজ্জভাবে। ভারতের ক্ষেত্রেও করপোরেট মিডিয়া বর্তমানে সেটাই করছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ, নত মস্তকে ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য বিনা বিচারে প্রচার করে চলেছে অধিকাংশ মিডিয়া হাউজ।  অর্থাৎ তাদের সম্প্রচারিত খবরের বড় অংশই হয় নিয়ন্ত্রিত অথবা কখনও কখনও অসত্য - এমন দাবিও করা হয়।  আসলে সিংহভাগ মিডিয়ার মালিক হচ্ছেন এক-একজন  করপোরেট পুঁজির মালিক বা পুঁজিপতি। এরা কি কখনও নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় - এমন খবর, তথ্য বা তত্ত্ব প্রচার করবে? করবে না, করেও না। আর এ...