সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সময়ের অপচয় কেন এবং কীভাবে হয়

সময়ের অপচয় কেন এবং কীভাবে হয়।

সময়ের অপচয় থেকে অসময়ের জন্ম হয়, আর এই অসময় থেকেই জন্ম হয় দুঃসময়ের। একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এই ‘সময় চক্রের ফাঁদে’ আষ্টেপিষ্টে আটকে পড়েছে। এই বাড়াবাড়ি রকমের আটকে পড়ার পেছনে বেশ কিছু পরস্পর-সম্পর্কিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সক্রিয় রয়েছে। এই প্রবন্ধে আমি সেগুলো খোঁজার চেষ্টা করবো। সঙ্গে থাকুন।—
সময়কে সময়মতো এবং ঠিকঠাক কাজে না লাগালে, অসময়ের জন্ম হয়। এই অসময় পরবর্তীকালে দুঃসময়ের জন্ম দেয়। তাকে পুনরায় ‘সময়ে’ পরিণত করাটা তখন সময়-সাপেক্ষ তো বটেই, তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। বিস্তারিত দেখুন এখানে

সময়ের অপচয় কেন এবং কীভাবে হয়?

সময়ের অপচয়ের কারণগুলিকে পাঁচটি প্রধান ধারায় ভাগ করে দেখা যেতে পারে। এ বিষয়ে আপনার কোনো ভাবনা থাকলে অবশ্যই প্রবন্ধের শেষে ‘মন্তব্য লিখুন’ অংশের কমেন্ট করে জানাতে পারেন।

১. ডিজিটাল বিভ্রান্তির সর্বগ্রাসী ফাঁদ: মনোযোগ অর্থনীতির শিকার ব্যক্তি

প্রথম এবং সবচেয়ে প্রকট কারণ হলো প্রযুক্তির আগ্রাসী রূপ। আমরা ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম হিসেবে এমন এক পরিবেশে বাস করছি, যেখানে শত শত প্রকৌশলী ও অ্যালগরিদম আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।

প্রাক্তন গুগল ডিজাইন এথিসিস্ট ট্রিস্টান হ্যারিস (Tristan Harris) বলছেন, স্মার্টফোন কোনো প্যাসিভ টুল নয়; এটি একটি ‘স্লট মেশিন’, যা আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন লুপকে কাজে লাগিয়ে আসক্তি তৈরি করে। আমরা ভাবি ফোন ব্যবহার করছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফোনই আমাদের ব্যবহার করছে। একটি সমীক্ষা বলছে, গড়পড়তা মানুষ দিনে ২৬০০ বারের বেশি ফোন টাচ করে এবং ভারী ব্যবহারকারীরা প্রতি ১০ মিনিটে একবার ফোন চেক করেন। এই অবস্থাকে বলে ‘ডুমস্ক্রলিং’ (Doomscrolling)—যেখানে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খারাপ খবরই পড়ে যায়, যা না সময় ম্যানেজমেন্টে কাজে লাগে, না মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোসফট করপোরেশনের ২০২৩ সালের এক গবেষণা বলছে, একজন অফিসকর্মী ইমেইল বা মেসেজে বাধাপ্রাপ্ত হলে পুনরায় গভীর মনোযোগ ফিরে পেতে গড়ে ২৩ মিনিট সময় নেন। বাস্তবে, আমরা দিনের বড় একটি অংশ কাটাই ‘মনোযোগের ধ্বংসাবশেষ’ (Attention Residue) নিয়ে—যেখানে শরীর এক কাজে থাকে, মন পড়ে থাকে অন্য কোন বিজ্ঞপ্তিতে। এটাই অসময়ের আধুনিক কারখানা।

২. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ‘ব্যস্ততার ভান’ সংস্কৃতি


দ্বিতীয় কারণটি অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রোথিত আছে। চাকরির বাজারে অস্থিরতা, গিগ ইকোনমি, এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ মানুষকে একইসঙ্গে ক্লান্ত ও অদক্ষ করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং (Guy Standing) ‘প্রিকারিয়েট’ (Precariat) শ্রেণির উত্থানের কথা বলেন—যাদের জীবন অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ অনিরাপদ। এই অনিশ্চয়তা স্বল্পমেয়াদি চিন্তাকে উৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথ রুদ্ধ করে।

আরও পড়ুন : গিগ ওয়ার্কার্স কাদের বলা হয়?

একইসঙ্গে উল্টো এক প্রবণতাও লক্ষণীয়—অনেক সংস্থায় ‘ব্যস্ততার ভান’ (Performative Busyness) একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কর্মীরা প্রকৃত কাজের চেয়ে উপস্থিতিইমেইলের দ্রুত জবাব দেওয়াকে অধিক গুরুত্ব দেন। এটি এক অদ্ভুত অসময় তৈরি করে, যেখানে মানুষ সারাদিন ক্লান্ত থাকে অথচ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সম্পন্ন করতে পারে না। জাপানি দার্শনিক কোহেই সাইতো (Kohei Saito) তাঁর ‘স্লো ডাউন’ তত্ত্বে বলেছেন, পুঁজিবাদের গতি-উন্মাদনা বাস্তবিক উৎপাদনশীলতাকে গ্রাস করে ফেলছে, আর আমরা স্থবির গতিতে ছুটছি।

৩. চয়েস প্যারালাইসিস ও ‘ভালো থাকার ফাঁদ’ :


তৃতীয় কারণটি মনস্তাত্ত্বিক—অতিরিক্ত বিকল্পের অস্তিত্ব। মনোবিজ্ঞানী ব্যারি শোয়ার্টজ (Barry Schwartz) ‘চয়েসের প্যারাডক্স’ (The Paradox of Choice) ধারণায় দেখিয়েছেন, যখন সামনে অনেক বিকল্প থাকে, মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায় এবং শেষ পর্যন্ত কিছুই করে না।

বর্তমানে একজন তরুণের জন্য ক্যারিয়ার, সম্পর্ক, জীবনশৈলী—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামনে এত বিকল্প থাকে যে ‘ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা’ মানুষকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলে। এই সিদ্ধান্তহীনতার নামান্তরই ‘অসময়’। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভাবতে গিয়ে আমরা বর্তমানকেও কাজে লাগাতে পারি না। গবেষণা বলছে, জেনারেশন জি-র (Generation Z) একটি বড় অংশ ‘ফিয়ার অফ বেটার অপশন’ (FOBO)-তে ভোগে—তারা সব সময় এই ভাবনায় ডুবে থাকে যে, আরও কোন ভালো অপশন আছে কি না। আর এই দ্বিধাতেই সময় গড়িয়ে যায়।

৪. ডোপামিন সংস্কৃতি ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তির পথরুদ্ধ

চতুর্থ কারণ রয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের রসায়নে। সামাজিক মাধ্যমে লাইক, শেয়ার, রিলস—সবই ডিজাইন করা হয়েছে তাৎক্ষণিক ডোপামিন ক্ষরণের জন্য। স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্না লেম্বকে (Anna Lembke) তার ‘ডোপামিন নেশন’ বইতে দেখিয়েছেন, আমরা যখন ক্রমাগত সস্তা ডোপামিন পেতে থাকি, তখন বাস্তব জীবনের গভীর তৃপ্তি (যেমন একটি বই পড়া, একটি জটিল প্রকল্প সম্পন্ন করা) আমাদের কাছে একঘেয়ে ও কষ্টকর লাগতে শুরু করে।

এভাবে এটি এক বিপজ্জনক চক্র তৈরি করে: গভীর কাজ এড়িয়ে যাওয়াঅস্থায়ী আনন্দে ডুবে থাকাঅপরাধবোধআরও গভীর কাজ এড়িয়ে যাওয়া। “সময়মতো সময়কে ঠিকঠাক কাজে না লাগানোর” সবচেয়ে শক্তিশালী আধুনিক রূপ এটি।

৫. মুক্ত সময়ের অদৃশ্যকরণ ও ‘ব্যবধান সংকোচ’

পঞ্চম কারণটি কাঠামোগত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ফাঁকা সময়গুলো—যেমন বাসের জন্য অপেক্ষা, লিফটে ওঠা, খাবারের পর পাঁচ মিনিট—যেগুলো আগে চিন্তা বা বিশ্রামে কাটত, এখন প্রযুক্তি সেই ‘মাইক্রো-টাইম’ গ্রাস করে নিয়েছে। আমরা আর কখনো একাকী নই; আর তাই নিজেকে নিয়ে চিন্তাও করতে পারি না।

দার্শনিক বাইয়ুং চুল হান (Byung-Chul Han) তাঁর ‘দ্য বার্নআউট সোসাইটি’ বইতে এই অবস্থাকে বলেছেন “অতিসক্রিয়তার অন্ধকার দিক”—আমরা বিশ্রাম করতে ভুলে গেছি, যে বিশ্রাম সৃজনশীলতার জন্ম দেয়। প্রকৃত ‘সময়’ হলো গভীর চিন্তা ও সৃজনশীল অবসরের ফসল। কিন্তু যখন সেই ফাঁকা সময়গুলোই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, তখন অসময়ই স্বাভাবিক অবস্থা বলে মনে হতে থাকে।

সারসংক্ষেপ: আধুনিক অসময়-চক্র

উপরোক্ত পাঁচটি কারণ মিলে আমাদের মনোজগতে একটি নিখুঁত ঝড় তৈরি করেছে —প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে, অর্থনীতি আমাদের ভবিষ্যৎ-ভাবনার ক্ষমতা সংকুচিত করছে, অতিরিক্ত বিকল্প আমাদের সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগাচ্ছে, ডোপামিন আসক্তি গভীর কাজকে কঠিন করছে, আর ফাঁকা মুহূর্তগুলোর বিলুপ্তি সৃজনশীলতার উৎস খরার মুখে ফেলছে।

মনে রাখতে হবে, এই সম্মিলিত শক্তিই বর্তমানে ‘অসময়’-কে মহামারীর আকার দান করেছে—যেখানে আমরা আক্ষরিক অর্থেই সময়ের ভেতর থেকেও সময়হীনতায় ভুগছি। তাই —
সময়কে সময় মতো কাজে লাগানোটা, সময়েরই দাবি। এই দাবি না পূরণ করলে সীমাহীন সমুদ্রে, খেতেই হবে খাবি।

মন্তব্যসমূহ

📂 আলী হোসেনের জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলি

হিন্দু কারা? তারা কীভাবে হিন্দু হল?

হিন্দু কারা? কীভাবে তারা হিন্দু হল? যদি কেউ প্রশ্ন করেন, অমিত শাহ হিন্দু হলেন কবে থেকে? অবাক হবেন তাই তো? কিন্তু আমি হবো না। কারণ, তাঁর পদবী বলে দিচ্ছে উনি এদেশীয়ই নন, ইরানি বংশোদ্ভুত। কারণ, ইতিহাস বলছে পারস্যের রাজারা ‘শাহ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এবং ‘শাহ’ শব্দটি পার্শি বা ফার্সি। লালকৃষ্ণ আদবানির নামও শুনেছেন আপনি। মজার কথা হল আদবানি শব্দটিও এদেশীয় নয়। আরবি শব্দ ‘আদবান’ থেকে উদ্ভূত। সুতরাং তাঁর পদবীও বলছে, তিনিও এদেশীয় নন। ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের বিশ্লেষণ বলছে, উচ্চবর্ণের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মানুষদের, উৎসভূমি হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। তারও আগে ছিল ইউরোপের ককেশাস অঞ্চলে। আসলে এরা (উচ্চবর্ণের মানুষ) কেউই এদেশীয় নয়। তারা নিজেদের আর্য বলে পরিচয় দিতেন এবং এই পরিচয়ে তারা গর্ববোধ করতেন। সিন্ধু সভ্যতা পরবর্তীকালে তারা পারস্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ ধরে এদেশে অভিবাসিত হয়েছেন। আর মধ্যযুগে এসে এদেরই উত্তরসূরী ইরানিরা (অমিত শাহের পূর্বপুরুষ) অর্থাৎ পারস্যের কিছু পর্যটক-ঐতিহাসিক, এদেশের আদিম অধিবাসীদের ’হিন্দু’ বলে অভিহিত করেছেন তাদের বিভিন্ন ভ্রমণ বৃত্তান্তে। ...

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা ও তার বিবর্তন আলী হোসেন  যদি প্রশ্ন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী? মনে হয় অনেকেই ঘাবড়ে যাবেন। কেউ বলবেন, তাঁর বাবা যখন ব্রাহ্ম ছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই ব্রাহ্ম হবেন। যারা লেখাপড়া জানেন না, তারা বলবেন, কেন! উনি তো হিন্দু ছিলেন। আবার কেউ কেউ তথ্য সহযোগে এও বলার চেষ্টা করবেন যে, উনি নাস্তিক ছিলেন। না হলে কেউ বলতে পারেন, ধর্মমোহের চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো?¹ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ভাবনার বিবর্তন  তাহলে সঠিক উত্তরটা কী? আসলে এর কোনোটাই সঠিক উত্তর নয়। চিন্তাশীল মানুষ-মাত্রই সারা জীবন ধরে ভাবতে থাকেন। ভাবতে ভাবতে তাঁর উপলব্ধি এগোতে থাকে ক্রমশঃ প্রগতির পথে। এই সময়কালে জগৎ ও জীবন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একে একে গড়ে তোলেন জীবনদর্শনের নিত্যনতুন পর্ব। তাই এ ধরনের চিন্তাশীল মানুষ আজীবন এক এবং অখণ্ড জীবনদর্শনের বার্তা বহন করেন না। সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায় তাঁর পথচলার গতিমুখ, গড়ে ওঠে উন্নততর জীবন দর্শন। মানুষ রবীন্দ্রনাথও তাই পাল্টে ফেলেছেন তাঁর জীবন ও ধর্মদর্শন; সময়ের এগিয়ে যাওয়াকে অনুসরণ করে। রবীন্দ্রনাথ ও  হিন্দু জাতীয়তাবাদ ১৮৬১ সালের ৭ই মে সোমবার রাত্রি ২টা ৩৮ ...

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি

ভাগ্য : মুসলিম মনস্তত্ত্ব, ধর্মদর্শন ও প্রগতি - লিখছেন আলী হোসেন  কপালের লেখন খণ্ডায় কার সাধ্য? জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কিংবা লেখাপড়া জানা-নাজানা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কথাটা মেনে নেয়। জীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাসে কপালের লেখনকে জায়গা করে দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। বরং বলা ভালো এব্যাপারে তারা অতিমাত্রায় উদার। মানুষের মনস্তত্বের এ-এক জটিল স্তর বিন্যাস। একই মানুষ বিভিন্ন সময়ে একই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণে ভিন্নভিন্ন দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে। এ রকমই একটি দৃষ্টিকোণ হলো কপাল বা ভাগ্যের ভূমিকাকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে ভাবা। কখনও সে ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, আবার কখনও নিজেই ভাগ্যের কাছে নির্দিধায় আত্ম সমর্পন করে। নিজের ব্যার্থতার পিছনে ভাগ্যের অদৃশ্য হাতের কারসাজির কল্পনা করে নিজের ব্যার্থতাকে ঢাকা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। মজার কথা, এক্ষেত্রে মুসলিম মানসের মনস্তত্ত্ব কখনও চেতনমনে আবার কখনও অবচেতন মনে উপরওয়ালাকে (আল্লাহকে) কাঠ গড়ায় তোলে বিনা দ্বিধায়। নির্দিধায় বলে দেয়, উপরওয়ালা রাজি না থাকলে কিছুই করার থাকেনা। সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সবই তাঁর (আল...

সীমান্ত আখ্যান, বাঙালির আত্মানুসন্ধানের ডিজিটাল আখ্যান

সময়ের সঙ্গে সমস্যার চরিত্র বদলায়। কিন্তু মুলটা বদলায় না। যদি সে সমস্যা ইচ্ছা করে তৈরি হয়ে থাকে বিশেষ সুবিধা ভোগেই লোভে, তবে তো অন্য কথা চলেই না। স্বনামধন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারের ডকুমেন্টারি ফিল্প 'সীমান্ত আখ্যান' দেখার পর এই উপলব্ধি মাথা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখলাম, দেশ ভাগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যার অবসান হয়নি। শুধু সমস্যার চরিত্রটা পাল্টেছে। এই যে সমস্যা রয়ে গেল, কোন গেল? তার উত্তর ও পাওয়া গেল 'সীমান্ত আখ্যান' এ। আসলে দেশ ভাগ তো দেশের জনগণ চাননি, চেয়েছেন দেশের নেতারা। চেয়েছেন তাঁদের ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত সুবিধাকে নিজেদের কুক্ষিগত করার নেশায়। আর এই নেশার রসদ যোগান দিতে পারার নিশ্চয়তা নির্ভর করে রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম নিজের হাতে থাকার ওপর। তাই রাজনীতিকরা এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য জনগণকে 'ডিভাইড এন্ড রুল' পলিছি দ্বারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন। এ সমস্যা নতুন না, ব্রিটিশ সরকার এর বীজ রোপণ করে গেছেন, এখন কেউ তার সুফল ভোগ করছে (রাজনীতিকরা) আর কেউ কুফল (জনগন)। 'সীমান্ত আখ্যান চোখে আঙুল দিয়ে দে...

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী

কাশ্মীর ফাইলস : প্রপাগান্ডার এক নয়া ব্রান্ড, কর্পোরেট পুঁজি ও রাজনৈতিক দলের গলাগলির এক সুচারু প্রদর্শনী রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মিরের জনগণের ভাগ্যলিপিতে লেখা হয়ে গেছে এই বিখ্যাত প্রবাদটির বিস্তারিত সারাৎসার। একদিকে পাকিস্তান আর অন্যদিকে ভারত – এই দুই প্রতিবেশি দেশের ভুরাজনৈতিক স্বার্থের যাঁতাকলে পড়ে তাদের এই হাল। কিন্তু কেন এমন হল? এই প্রশ্নের উত্তর জানে না এমন মানুষ ভুভারতে হয়তো বা নেই। কিন্তু সেই জানার মধ্যে রয়েছে বিরাট ধরণের ফাঁক। সেই ফাঁক গলেই ঢুকেছে কাশ্মির ফাইলসের মত বিজেপির রাজনৈতিক ন্যারেটিভ যা তারা বহুকাল ধরে করে চলেছে অন্য আঙ্গিকে। এবার নতুন মাধ্যমে এবং নবরূপে তার আগমন ঘটেছে, যায় নাম সিনেমা বা সেলুলয়েড প্রদর্শনী। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সৌজন্যে অনেক আগেই সফলভাবে তারা এই ন্যারেটিভ দিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করে চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। টেলিভিশন সম্প্রচারে কর্পোরেট পুজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে যার সূচনা হয়েছিল। রাষ্ট্রশক্তিকে কুক্ষিগত করতে না পারলে দেশের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব নয়, একথা সাধারণ নিরক্ষর নাগরিক এবং ত...

শিক্ষা কী, কেন প্রয়োজন এবং কীভাবে অর্জন করা যায়?

শিক্ষা কী, কেন এবং কীভাবে অর্জন করতে হয়? সূচিপত্র : What is education, why it is needed and how to achieve it শিক্ষা কী শিক্ষা হল এক ধরনের অর্জন, যা নিজের ইচ্ছা শক্তির সাহায্যে নিজে নিজেই নিজের মধ্যে জমা করতে হয়। প্রকৃতি থেকেই সেই অর্জন আমাদের চেতনায় আসে। সেই চেতনাই আমাদের জানিয়ে দেয়, জগৎ ও জীবন পরিচালিত হচ্ছে প্রকৃতির কিছু অলংঘনীয় নিয়ম-নীতি দ্বারা। গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ শক্তিকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজে লাগালেই এই নিয়মনীতিগুলো আমাদের আয়ত্বে আসে। এই নিয়ম-নীতিগুলো জানা, বোঝা এবং সেই জানা-বোঝার ওপর ভিত্তি করেই জগৎ ও জীবনকে সর্বোত্তম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার পথ খুঁজে বের করার শক্তি অর্জন করা যায়। এই শক্তিই হল শিক্ষা। এক কথায় : শিক্ষা হল একধরনের সামর্থ বা শক্তি যা জগত, জীবন ও রাষ্ট্র-পরিচালনার নিয়মগুলো জানা, বোঝা এবং তাকে সফলভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করা যায় এবং তাকে প্রয়োগ করার মাধ্যমে মানুষ তার জীবনকে সুন্দর ও সফল করে তুলতে পারে। মনে রাখতে হবে, এই শিক্ষা কখনও কারও মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না। এখন প্রশ্ন হল, শিক্ষা অর্জনের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিটা আসলে কী। স...

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি : নেতিবাচক রাজনীতি চর্চা - আলী হোসেন আলী হোসেন বিচার একটি যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। বিচারক কখনই সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না, যদি না এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা ও তার কর্মকর্তারা উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং বিচারককে তা সরবরাহ করতে পারেন। আর বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি শক্তির আধার; তা যার হাতে থাকে, তিনিই বিচারক। এই শক্তি ন্যায়বিচার তখনই দিতে পারে, যখন বিচারক নিরপেক্ষ থাকার সৎ সাহস দেখান এবং সাংবিধানিক আইন এবং তার প্রয়োগ বিষয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তবে তাঁর সফলতা নির্ভর করে তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনজীবীরা কতটা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই তথ্য বিচারকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, তার উপর। তাই একজন বিচারক বা বিচার ব্যবস্থা যা বিধান দেয়, তা সব সময় একশ শতাংশ সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত হবে - এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কোনো একটি পক্ষ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে ন্যায় বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, ...

জল, না পানি : জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয়

জল নিয়ে জলঘোলা করা পানির মত সহজ নয় আলী হোসেন  সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে চিত্র শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য পানি শব্দকে বাংলা নয় বলে দাবি করেছেন। বলেছেন, "আমরা কোনোদিন কখনও বাংলা ভাষায় পানি (শব্দটা) ব্যবহার করি না"। শুধু তা-ই নয়, পানি শব্দের ব্যবহারের মধ্যে তিনি 'সাম্প্রদায়িকতার ছাপ'ও দেখতে পেয়েছেন। প্রশ্ন হল - এক, এই ভাবনা কতটা বাংলা ভাষার পক্ষে স্বাস্থ্যকর এবং কতটা 'বাংলা ভাষার ইতিহাস' সম্মত? দুই, জল বা পানি নিয়ে যারা জলঘোলা করছেন তারা কি বাংলাকে ভালোবেসে করছেন? মনে হয় না। কারণ, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এরা কেউ নিজের সন্তানকে বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াননি বা পড়ান না। ব্যবহারিক জীবনেও তারা বাংলার ভাষার চেয়ে ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে বা গান শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, বলা ভালো গর্ববোধ করেন। প্রসংগত মনে রাখা দরকার, বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যারা ভর্তি হয়, তারা অধিকাংশই গরীব ঘরের সন্তান। বলা ভালো, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তারাই বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কারণ, সন্তানকে বাংলা মিডিয়ামে পড়ানোর পাশাপাশি, বা...

নিম্নবর্গের মানুষ মার খাচ্ছে কেন

নিম্নবর্গের মানুষ কীভাবে পিছিয়ে পড়েছেন? সমাধান কীভাবে? এদেশের নিম্নবর্গের মানুষ নিজেদের বাঁচাতে যুগ যুগ ধরে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। কখনও বৌদ্ধ (প্রাচীন যুগ), কখনও মুসলমান (মধুযুগ), কিম্বা কখনো খ্রিস্টান (আধুনিক যুগ) হয়েছে। কিন্তু কখনই নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে পাল্টানোর কথা ভাবেনি। পরিবর্তন হচ্ছে অলংঘনীয় প্রাকৃতিক নিয়ম। যারা এই নিয়ম মেনে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, তারাই লাভবান হয়, টিকে থাকে। “পাল্টে গেলেই জীবন বাড়ে না পাল্টালে নয়, জীবন মানেই এগিয়ে যাওয়া নইলে মৃত্যু হয়” জীবনের এই চরম সত্য তারা অধিকাংশই উপলব্ধি করতে পারেনি। পৃথিবীর যেকোন উন্নত জাতির দিকে তাকান, তারা দ্রুততার সঙ্গে এই পরিবর্তনকে মেনে নিজেদেরকে পুনর্গঠন করে নিয়েছে। যারা পারেনি বা নেয়নি তারাই মার খাচ্ছে, অতীতেও খেয়েছে। বুদ্ধিমান জাতি নিজের দুর্বলতাকে মেনে নেয় এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময়ের সঙ্গে তাল রেখে নিজেদের চিন্তা এবং চেতনায় পরিবর্তন আনে। খ্রিষ্টান, ইহুদি-সহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন জাতি - যারাই এই পরিবর্তন মেনে নিয়েছে তারাই আরও উন্নত এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মহানবীর (সঃ) গৌরবময় উত্থান (যা এক ধরণ...

আধুনিক মিডিয়া : কর্পোরেট পুঁজির (পুঁজিপতিদের) তোতাপাখি

গোদি মিডিয়া : কর্পোরেট পুঁজির তোতাপাখি পশ্চিমী মিডিয়াকে 'ইসরাইল সরকারের তোতাপাখি' নামে পরিচয় দেওয়া হয় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মিডিয়া হাউজের পক্ষ থেকে। সম্প্রতি একইভাবে ভারতীয় কর্পোরেট মিডিয়া ভারত সরকার তথা 'কর্পোরেট পুঁজির  তোতাপাখি' হিসাবে পরিচয় পাচ্ছে, যাকে নিন্দুকেরা 'গোদী মিডিয়া' নামে অভিহিত করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা সম্পর্কে ইসরাইল যা বলে, ইউরোপ ও আমেরিকার মিডিয়া, তোতা পাখির মতো তা-ই প্রচার করে। সাংবাদিকতার প্রধান প্রধান শর্তগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরাইলের দেওয়া তথ্যই তারা প্রচার করে অন্ধ ও নির্লজ্জভাবে। ভারতের ক্ষেত্রেও করপোরেট মিডিয়া বর্তমানে সেটাই করছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ, নত মস্তকে ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য বিনা বিচারে প্রচার করে চলেছে অধিকাংশ মিডিয়া হাউজ।  অর্থাৎ তাদের সম্প্রচারিত খবরের বড় অংশই হয় নিয়ন্ত্রিত অথবা কখনও কখনও অসত্য - এমন দাবিও করা হয়।  আসলে সিংহভাগ মিডিয়ার মালিক হচ্ছেন এক-একজন  করপোরেট পুঁজির মালিক বা পুঁজিপতি। এরা কি কখনও নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় - এমন খবর, তথ্য বা তত্ত্ব প্রচার করবে? করবে না, করেও না। আর এ...