সময়ের অপচয় কেন এবং কীভাবে হয়।
সময়ের অপচয় থেকে অসময়ের জন্ম হয়, আর এই অসময় থেকেই জন্ম হয় দুঃসময়ের। একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এই ‘সময় চক্রের ফাঁদে’ আষ্টেপিষ্টে আটকে পড়েছে। এই বাড়াবাড়ি রকমের আটকে পড়ার পেছনে বেশ কিছু পরস্পর-সম্পর্কিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সক্রিয় রয়েছে। এই প্রবন্ধে আমি সেগুলো খোঁজার চেষ্টা করবো। সঙ্গে থাকুন।—সময়কে সময়মতো এবং ঠিকঠাক কাজে না লাগালে, অসময়ের জন্ম হয়। এই অসময় পরবর্তীকালে দুঃসময়ের জন্ম দেয়। তাকে পুনরায় ‘সময়ে’ পরিণত করাটা তখন সময়-সাপেক্ষ তো বটেই, তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। বিস্তারিত দেখুন এখানে।
সময়ের অপচয় কেন এবং কীভাবে হয়?
সময়ের অপচয়ের কারণগুলিকে পাঁচটি প্রধান ধারায় ভাগ করে দেখা যেতে পারে। এ বিষয়ে আপনার কোনো ভাবনা থাকলে অবশ্যই প্রবন্ধের শেষে ‘মন্তব্য লিখুন’ অংশের কমেন্ট করে জানাতে পারেন।
১. ডিজিটাল বিভ্রান্তির সর্বগ্রাসী ফাঁদ: মনোযোগ অর্থনীতির শিকার ব্যক্তি
প্রথম এবং সবচেয়ে প্রকট কারণ হলো প্রযুক্তির আগ্রাসী রূপ। আমরা ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম হিসেবে এমন এক পরিবেশে বাস করছি, যেখানে শত শত প্রকৌশলী ও অ্যালগরিদম আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।
প্রাক্তন গুগল ডিজাইন এথিসিস্ট ট্রিস্টান হ্যারিস (Tristan Harris) বলছেন, স্মার্টফোন কোনো প্যাসিভ টুল নয়; এটি একটি ‘স্লট মেশিন’, যা আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন লুপকে কাজে লাগিয়ে আসক্তি তৈরি করে। আমরা ভাবি ফোন ব্যবহার করছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফোনই আমাদের ব্যবহার করছে। একটি সমীক্ষা বলছে, গড়পড়তা মানুষ দিনে ২৬০০ বারের বেশি ফোন টাচ করে এবং ভারী ব্যবহারকারীরা প্রতি ১০ মিনিটে একবার ফোন চেক করেন। এই অবস্থাকে বলে ‘ডুমস্ক্রলিং’ (Doomscrolling)—যেখানে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খারাপ খবরই পড়ে যায়, যা না সময় ম্যানেজমেন্টে কাজে লাগে, না মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোসফট করপোরেশনের ২০২৩ সালের এক গবেষণা বলছে, একজন অফিসকর্মী ইমেইল বা মেসেজে বাধাপ্রাপ্ত হলে পুনরায় গভীর মনোযোগ ফিরে পেতে গড়ে ২৩ মিনিট সময় নেন। বাস্তবে, আমরা দিনের বড় একটি অংশ কাটাই ‘মনোযোগের ধ্বংসাবশেষ’ (Attention Residue) নিয়ে—যেখানে শরীর এক কাজে থাকে, মন পড়ে থাকে অন্য কোন বিজ্ঞপ্তিতে। এটাই অসময়ের আধুনিক কারখানা।
২. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ‘ব্যস্ততার ভান’ সংস্কৃতি
দ্বিতীয় কারণটি অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রোথিত আছে। চাকরির বাজারে অস্থিরতা, গিগ ইকোনমি, এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ মানুষকে একইসঙ্গে ক্লান্ত ও অদক্ষ করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদ গাই স্ট্যান্ডিং (Guy Standing) ‘প্রিকারিয়েট’ (Precariat) শ্রেণির উত্থানের কথা বলেন—যাদের জীবন অনিশ্চিত, ভবিষ্যৎ অনিরাপদ। এই অনিশ্চয়তা স্বল্পমেয়াদি চিন্তাকে উৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথ রুদ্ধ করে।
আরও পড়ুন : গিগ ওয়ার্কার্স কাদের বলা হয়?
একইসঙ্গে উল্টো এক প্রবণতাও লক্ষণীয়—অনেক সংস্থায় ‘ব্যস্ততার ভান’ (Performative Busyness) একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কর্মীরা প্রকৃত কাজের চেয়ে উপস্থিতি ও ইমেইলের দ্রুত জবাব দেওয়াকে অধিক গুরুত্ব দেন। এটি এক অদ্ভুত অসময় তৈরি করে, যেখানে মানুষ সারাদিন ক্লান্ত থাকে অথচ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সম্পন্ন করতে পারে না। জাপানি দার্শনিক কোহেই সাইতো (Kohei Saito) তাঁর ‘স্লো ডাউন’ তত্ত্বে বলেছেন, পুঁজিবাদের গতি-উন্মাদনা বাস্তবিক উৎপাদনশীলতাকে গ্রাস করে ফেলছে, আর আমরা স্থবির গতিতে ছুটছি।
৩. চয়েস প্যারালাইসিস ও ‘ভালো থাকার ফাঁদ’ :
তৃতীয় কারণটি মনস্তাত্ত্বিক—অতিরিক্ত বিকল্পের অস্তিত্ব। মনোবিজ্ঞানী ব্যারি শোয়ার্টজ (Barry Schwartz) ‘চয়েসের প্যারাডক্স’ (The Paradox of Choice) ধারণায় দেখিয়েছেন, যখন সামনে অনেক বিকল্প থাকে, মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায় এবং শেষ পর্যন্ত কিছুই করে না।
বর্তমানে একজন তরুণের জন্য ক্যারিয়ার, সম্পর্ক, জীবনশৈলী—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামনে এত বিকল্প থাকে যে ‘ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা’ মানুষকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলে। এই সিদ্ধান্তহীনতার নামান্তরই ‘অসময়’। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা ভাবতে গিয়ে আমরা বর্তমানকেও কাজে লাগাতে পারি না। গবেষণা বলছে, জেনারেশন জি-র (Generation Z) একটি বড় অংশ ‘ফিয়ার অফ বেটার অপশন’ (FOBO)-তে ভোগে—তারা সব সময় এই ভাবনায় ডুবে থাকে যে, আরও কোন ভালো অপশন আছে কি না। আর এই দ্বিধাতেই সময় গড়িয়ে যায়।
৪. ডোপামিন সংস্কৃতি ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তির পথরুদ্ধ
চতুর্থ কারণ রয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের রসায়নে। সামাজিক মাধ্যমে লাইক, শেয়ার, রিলস—সবই ডিজাইন করা হয়েছে তাৎক্ষণিক ডোপামিন ক্ষরণের জন্য। স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্না লেম্বকে (Anna Lembke) তার ‘ডোপামিন নেশন’ বইতে দেখিয়েছেন, আমরা যখন ক্রমাগত সস্তা ডোপামিন পেতে থাকি, তখন বাস্তব জীবনের গভীর তৃপ্তি (যেমন একটি বই পড়া, একটি জটিল প্রকল্প সম্পন্ন করা) আমাদের কাছে একঘেয়ে ও কষ্টকর লাগতে শুরু করে।
এভাবে এটি এক বিপজ্জনক চক্র তৈরি করে: গভীর কাজ এড়িয়ে যাওয়া → অস্থায়ী আনন্দে ডুবে থাকা → অপরাধবোধ → আরও গভীর কাজ এড়িয়ে যাওয়া। “সময়মতো সময়কে ঠিকঠাক কাজে না লাগানোর” সবচেয়ে শক্তিশালী আধুনিক রূপ এটি।
৫. মুক্ত সময়ের অদৃশ্যকরণ ও ‘ব্যবধান সংকোচ’
পঞ্চম কারণটি কাঠামোগত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ফাঁকা সময়গুলো—যেমন বাসের জন্য অপেক্ষা, লিফটে ওঠা, খাবারের পর পাঁচ মিনিট—যেগুলো আগে চিন্তা বা বিশ্রামে কাটত, এখন প্রযুক্তি সেই ‘মাইক্রো-টাইম’ গ্রাস করে নিয়েছে। আমরা আর কখনো একাকী নই; আর তাই নিজেকে নিয়ে চিন্তাও করতে পারি না।
দার্শনিক বাইয়ুং চুল হান (Byung-Chul Han) তাঁর ‘দ্য বার্নআউট সোসাইটি’ বইতে এই অবস্থাকে বলেছেন “অতিসক্রিয়তার অন্ধকার দিক”—আমরা বিশ্রাম করতে ভুলে গেছি, যে বিশ্রাম সৃজনশীলতার জন্ম দেয়। প্রকৃত ‘সময়’ হলো গভীর চিন্তা ও সৃজনশীল অবসরের ফসল। কিন্তু যখন সেই ফাঁকা সময়গুলোই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, তখন অসময়ই স্বাভাবিক অবস্থা বলে মনে হতে থাকে।
সারসংক্ষেপ: আধুনিক অসময়-চক্র
উপরোক্ত পাঁচটি কারণ মিলে আমাদের মনোজগতে একটি নিখুঁত ঝড় তৈরি করেছে —প্রযুক্তি আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে, অর্থনীতি আমাদের ভবিষ্যৎ-ভাবনার ক্ষমতা সংকুচিত করছে, অতিরিক্ত বিকল্প আমাদের সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগাচ্ছে, ডোপামিন আসক্তি গভীর কাজকে কঠিন করছে, আর ফাঁকা মুহূর্তগুলোর বিলুপ্তি সৃজনশীলতার উৎস খরার মুখে ফেলছে।
মনে রাখতে হবে, এই সম্মিলিত শক্তিই বর্তমানে ‘অসময়’-কে মহামারীর আকার দান করেছে—যেখানে আমরা আক্ষরিক অর্থেই সময়ের ভেতর থেকেও সময়হীনতায় ভুগছি। তাই —
সময়কে সময় মতো কাজে লাগানোটা, সময়েরই দাবি। এই দাবি না পূরণ করলে সীমাহীন সমুদ্রে, খেতেই হবে খাবি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন