ভারতের লেবার কোড বা শ্রম আইনের সীমাবদধতা:
ভারতের নতুন চারটি শ্রম সংহিতা (লেবার কোড) ২০২৫ সালের নভেম্বরে কার্যকর হওয়ার পর থেকে দেশের কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সরকার যেখানে এই সংস্কারকে ‘যুগান্তকারী’ এবং ‘শ্রমিক-বান্ধব’ বলে অভিহিত করছে, সেখানে প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন ও বিশেষজ্ঞরা একে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে ‘শ্রম-বিরোধী’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন । এই আইনগুলোর সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।কাজের নিরাপত্তা খর্ব: সহজেই ছাঁটাইয়ের সুযোগ
এই নতুন আইনের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর ফলে স্থায়ী কাজের সুযোগ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।১) ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ নীতি:
ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোডের মাধ্যমে সরকারের অনুমতি ছাড়াই কর্মী ছাঁটাই করা যাবে, কর্মচারী কমানো (রিট্রেঞ্চমেন্ট) বা কারখানা বন্ধ করার সীমা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ জন করা হয়েছে । এর ফলে দেশের ৯০% এর বেশি কারখানা এখন সহজেই শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারবে, যা ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ নীতিকে বৈধতা দেয় ।
২) স্থায়ী অস্থায়িত্ব (Fixed-Term Employment):
নতুন কোডে ফিক্সড-টার্ম এমপ্লয়মেন্ট চালু করা হয়েছে, যা মূলত স্থায়ী চাকরির জায়গায় অস্থায়ী নিয়োগের পথ খুলে দিয়েছে। এতে কর্মীরা দীর্ঘমেয়াদী সেবা ও সিনিয়রিটির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন ।
নিয়োগকর্তাদের সুবিধার জন্য পুরনো আইনের মৌলিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
⏰ কাজের সময় বনাম জীবন: ১২ ঘন্টা কর্মদিবস
নিয়োগকর্তাদের সুবিধার জন্য পুরনো আইনের মৌলিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১) দীর্ঘ কাজের সময়:
পেশাগত সুরক্ষা সংক্রান্ত নতুন কোড (OSHWC Code) কার্যকরভাবে কর্মদিবসের সময়সীমা ৮ ঘন্টা থেকে বাড়িয়ে ১২ ঘন্টা করার অনুমতি দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হচ্ছে । ব্রিটিশ আমলে ড. বি.আর. আম্বেদকর ৮ ঘন্টা কাজের নীতি চালু করেছিলেন, যা এখন বাতিলের পথে ।
২) 🤝 মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা:
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা সরকার সার্বিক সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলেও, আইনের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে।
৩) অর্থহীন ন্যূনতম মজুরি:
মজুরি কোডে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্ধারিত ‘ফ্লোর ওয়েজ’ (ন্যূনতম ভিত্তি মজুরি) চালু করা হয়েছে, যা বর্তমানে মাত্র ১৭৮ টাকা প্রতিদিন । এই হার অনেক রাজ্যের প্রচলিত ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে রাজ্যগুলি নিজেদের মজুরি আরও কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে এবং এটি একটি ‘রেস টু দ্য বটম’-এ পরিণত হবে ।
৪) সামাজিক নিরাপত্তার গণ্ডি বাড়ানো:
নতুন আইনে ইপিএফ (PF) ও ইএসআই-এর মতো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পেতে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী থাকার শর্ত (থ্রেশহোল্ড) বহাল রাখা হয়েছে বা কিছু ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে । ফলে, ছোট কারখানার অসংখ্য শ্রমিক এই সুরক্ষার আওতার বাইরে চলে যাবেন।
৫) প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির কর্মীরা:
প্ল্যাটফর্ম ও গিগ কর্মীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল গঠনের কথা বলা হলেও, তহবিল গঠনের উৎস (যেমন, এগ্রিগেটরদের টার্নওভারের ১-২%) অপ্রতুল এবং সুবিধাগুলো বাধ্যতামূলক নয় ।
৬) 🔇 ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার খর্ব
শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং নিজেদের দাবি আদায়ের মৌলিক অধিকারগুলোকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে নতুন আইন।৭) ধর্মঘটের ওপর নিষেধাজ্ঞা:
এখন যে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট করতে গেলে ১৪ দিনের পূর্ব notice দিতে হবে এবং সালিশি প্রক্রিয়া চলাকালীন ধর্মঘট নিষিদ্ধ করা হয়েছে । এটি শ্রমিকদের দর কষাকষির ক্ষমতাকে কার্যকরভাবে শেষ করে দিতে পারে।
৮) ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা:
নতুন নিয়মে ইউনিয়ন গঠন ও নিবন্ধন করা আগের চেয়ে কঠিন করে তোলা হয়েছে। এমনকি, RSS-সমর্থিত ভারতীয় মজদুর সংঘ (BMS)-ও এই কোডের কিছু ধারা, বিশেষ করে শিল্প সম্পর্ক ও পেশাগত সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে "শ্রমিক-বান্ধব নয়" বলে সমালোচনা করেছে ।
শ্রম সংহিতাগুলো কার্যকর হতে এখনও মাত্র কয়েক মাস হয়েছে, তবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ২৬ নভেম্বর ২০২৫-এ দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও ধর্মঘট এরই প্রমাণ ।
আপনি কি এই আইনের কোনো নির্দিষ্ট ধারা বা এর প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চান?
৯) 🚺 নারী ও প্রান্তিক শ্রমিক: নতুন বিপদ
মহিলাদের রাতের শিফটে কাজের অনুমতি দেওয়া হলেও, তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো জোরালো বিধান রাখা হয়নি । অন্যদিকে, আন্তঃরাজ্য অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার পুরনো আইন (ISMW Act, 1979) খর্ব করা হয়েছে। এখন কেবলমাত্র ৫০ বা ততোধিক শ্রমিক নিয়োগ করলেই নিয়োগকর্তা আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আসবেন, যা আগে ৫ জনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল ।১০) 👁️ খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা (Inspection Mechanism) দুর্বল করা
‘ইন্সপেক্টর-কাম-ফ্যাসিলিটেটর’ ধারণা চালু করে কার্যত নিয়মিত কারখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়েছে । স্ব-প্রমাণীকরণ (Self-certification) এবং এলোমেলো (random) পরিদর্শন পদ্ধতি চালু হওয়ায়, মজুরি না দেওয়া, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করানোর মতো অপরাধ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ।গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ছেদ
এই যুগান্তকারী আইন প্রণয়নের আগে ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার (ট্রাইপারটাইট কনসালটেশন) ঐতিহ্যবাহী ফোরাম ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্স (ILC) ২০১৫ সালের পর আর ডাকা হয়নি । ২০২০ সালে বিরোধী দলদের সংসদ বয়কটের সময় এই বিলগুলি খুব দ্রুত পাস করানো হয়, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আঘাত বলে মনে করছেন অনেকে ।শ্রম সংহিতাগুলো কার্যকর হতে এখনও মাত্র কয়েক মাস হয়েছে, তবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ২৬ নভেম্বর ২০২৫-এ দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও ধর্মঘট এরই প্রমাণ ।
আপনি কি এই আইনের কোনো নির্দিষ্ট ধারা বা এর প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চান?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন